প্রথম পাতা প্রবন্ধ মহা শিবরাত্রি: প্রাচীন ইতিহাস, শিব-পার্বতীর বিবাহ ও বিশ্বজুড়ে শিব উপাসনার ধারাবাহিকতা

মহা শিবরাত্রি: প্রাচীন ইতিহাস, শিব-পার্বতীর বিবাহ ও বিশ্বজুড়ে শিব উপাসনার ধারাবাহিকতা

18 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায় 

যে যে পালা-পার্বণ সারা ভারতবর্ষে প্রাচীন যুগ থেকে উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে, তার মধ্যে অন্যতম হল ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথিতে শিব ও পার্বতীর বিবাহ উপলক্ষে পালিত মহা শিবরাত্রি উৎসব।

এই উৎসব অতি প্রাচীন। ঐতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে অনুমেয় যে, সিন্ধু সভ্যতা কিংবা তারও আগে শিবের উপাসনা, শিবলিঙ্গের পূজা এবং দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনা সমাজজীবনে প্রচলিত ছিল। পরে বৈদিক যুগে ‘শিব’ আর্যদের উপাস্য দেবতা ‘রুদ্র’-এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। প্রাচীন অনার্য দেবতা শিব ও আর্যদের দেবতা রুদ্র মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠেন। প্রাক্-বৈদিক যুগ থেকেই শিব বা রুদ্র সৃজনশীলতা ও উর্বরতার দেবতা হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন।

শিবের মধ্যে রয়েছে দুই বৈপরীত্য রূপ। একদিকে তিনি শ্মশানচারী, শ্মশানবাসী; ভূত-প্রেত তাঁর অনুচর। তিনি কাপালিক ও অঘোরী সাধনার উপাস্য দেবতা। আবার অন্যদিকে এই শিবই কৈলাসে পার্বতীসহ সপরিবারে অবস্থানরত, সমাজের আপামর মানুষের সংসারে আরাধ্য দেবতা।

শিবের মাহাত্ম্য প্রাক্-বৈদিক যুগ থেকে যেমন পাওয়া যায়, তেমনই বৈদিক সভ্যতা এবং পরবর্তীকালে শুঙ্গ, কুষাণ ও গুপ্ত যুগেও শিব ও শিব-জ্যোতির্লিঙ্গ পূজার উল্লেখ রয়েছে। বৌদ্ধ, জৈন, সুলতানি ও বৈষ্ণব যুগেও শিব-জ্যোতির্লিঙ্গ প্রতীকে শিব আরাধ্য হয়েছেন জনমানসে।

দেবাদিদেব মহাদেব, শিব, রুদ্র প্রভৃতি একই দেবতার বিভিন্ন নাম। শিবের মাহাত্ম্যের উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদ, অথর্ববেদ, স্কন্দ পুরাণ, লিঙ্গ পুরাণ, পদ্ম পুরাণ, শিব পুরাণ ও শৈব আগমে। শিবের কাহিনী পাওয়া যায় ব্যাধ কালকেতু ও ফুল্লরার প্রসঙ্গসম্বলিত চণ্ডীমঙ্গল কাব্যেও।

শুধু ভারতেই নয়, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতেও শিবরাত্রি মহাসমারোহে পালিত হয়। আধুনিক যুগে ভারতীয় যোগচর্চা বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছে, যার অন্যতম অঙ্গ শৈব সাধনা।

পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায়ও এই সময়ের সঙ্গে মিল রেখে উৎসব পালিত হয়। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় ‘প্রায়াপুস’ নামে এক উর্বরতার দেবতা ছিলেন। রোমান সভ্যতায় ‘মিউটুনাস-টিউটুনাস’ যুগল দেবতার সঙ্গে শিব-দুর্গার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মিশরীয় সভ্যতায় ‘আইসিস’ ও ‘মিন’ যুগল দেবতা ছিলেন। নরওয়ে ও সুইডেনে ‘ফ্রেয়ার’ ও ‘ফ্রেয়া’ দেবদ্বয়ের উপাসনা প্রচলিত ছিল।

ভারতবর্ষে বহু প্রাচীন শিবমন্দির রয়েছে। যেমন—কাশীর বিশ্বনাথ-অন্নপূর্ণার মন্দির,গুজরাটের সোমনাথের মন্দির, হিমালয়ের পাদদেশে কেদার নাথের মন্দির,বদ্রীনাথের মন্দির,উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরে লিঙ্গরাজ মন্দির,বাংলায় হুগলীতে তারকেশ্বরের মন্দির,দক্ষিণ ২৪ পরগণায় কেশবেশ্বরের মন্দির,বিহারের উজ্জয়িনীতে মহাবালেশ্বর মন্দির, বিহারের দেওঘরে বৈদ্যনাথ মন্দির প্রভৃতি। নেপালে পশুপতিনাথের মন্দির, ইন্দোনেশিয়াতে শঙ্করনাথ মন্দির,মরিশাসে ভুতনাথের মন্দির, মালয়েশিয়ায় রুদ্রপতিনাথের মন্দির ইত্যাদি।

বাংলাতে বর্ধমানে ১০৮ শিব মন্দির, চুঁচুড়াতে ষন্ডেশ্বরের মন্দির, নৈহাটিতে বুড়োশিবের মন্দির, আঁটপুরে জোড়া শিবের মন্দির, হাটখোলায় মহম্মদ রমজান লেনে প্রাচীন কৈলাসেশ্বরের মন্দির, কলকাতায় কালিঘাটে নকুলেশ্বরের মন্দির, দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর মন্দিরে দ্বাদশ শিব মন্দির,খিদিরপুরের ভুকৈলাসে মহাশিবের মন্দির ইত্যাদি। 

১৭৮১ সালে রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল খিদিরপুরের ভূকৈলাসে শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, মাতৃসাধক রামপ্রসাদও এখানে এসেছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় নদীয়ায় বহু শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এক কথায় বলা যায়, সারা ভারতবর্ষে এবং বাংলার প্রায় প্রতিটি জনবসতিতেই শিবের মন্দির রয়েছে।

শিব রুদ্র—প্রলয়ের দেবতা, আবার তিনিই চিরসত্য, চিরশাশ্বত, শান্ত যোগীবর। শিব-পার্বতী পুরুষ ও প্রকৃতির মহামিলনাত্মক রূপ। জগতের চালিকা শক্তি ও সৃজনের গুঢ় রহস্যের প্রতীক শিব-শক্তি।যা কিছু সত্য, যা কিছু সুন্দর—তাই শিব, তাই মঙ্গল।
“সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্”

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.