পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের সেই লেখা— “অন্ধজনে দেহো আলো, মৃতজনে দেহো প্রাণ।” আর তখনই মনে হয়, পুরোনো বছরের অবধারিত বিদায় আর নতুন বছরের শুভাগমনের প্রাক্কালে ওদের অভিনন্দিত করাই আমাদের মানব সভ্যতার আশু কর্তব্য হয়ে উঠুক।
ওরা কারা? ওরা জন্মের পর থেকেই বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার শিকার।
পাড়াপ্রতিবেশিরা বলত, তার জন্মের পরপরেই—“এই মেয়েকে ঘরে রেখে কী করবে? ফেলে দাও, বা কোনও আশ্রমে দিয়ে দাও। ফালতু এই মেয়ে গরিবের সংসারের বোঝা হয়ে উঠবে দেখবে একদিন!”
মায়ের চোখের জল সেদিন সবার চোখের আড়ালে দু’গাল বেয়ে নামত। তবু তিনি দু’হাতে আগলে রাখতেন তাঁর সন্তানকে। হোক না মেয়ে অন্ধ, তবুও সে তাঁদেরই সন্তান। আরও জোরে তাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন মা-বাবা। সেদিন অন্যের কথা শুনে তাঁরা মেয়েকে বিসর্জন দেননি।
আর আজ সেই মেয়ে—আসামের হতদরিদ্র ঘরের দৃষ্টিহীন কন্যা সিমু দাস, সম্প্রতি নভেম্বর ২০২৫-এ দৃষ্টিহীন মহিলা ক্রিকেটের T-20 বিশ্বকাপে ভারতকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। যাকে এক সময় আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেওয়ার কথা হয়েছিল, সেই মেয়েই আজ বিশ্বজয়ী।
সিমুর সতীর্থ, দলের অধিনায়ক দীপিকা টি.সি.—ছোটবেলা থেকেই সমাজ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে সে সমাজের কাছে অপাঙক্তেয়, কারণ সে জন্মান্ধ। ভারতের আদিবাসী জনজাতি গোষ্ঠীর মেয়ে ফুলা সরেন জন্ম থেকেই চোখের দৃষ্টি না থাকা সত্ত্বেও নেপালের বিরুদ্ধে একা ৪৪ রান করে পেলেন “Best Batter of the Match”।
দীপিকা, সিমু, ফুলা, গঙ্গা, আনিখা, সালমা, সিমরান, করুণা… এঁরা এখন বিশ্বসেরা। কিন্তু আজকের সাফল্যের আগে তাঁরা সমাজের কাছে প্রিয় ছিলেন না। গরিব ঘরের সন্তান এঁরা; দু’বেলা খাবার জোটানোই ছিল সংগ্রাম। কিন্তু হাল না ছেড়ে নিজেদের প্রস্তুত করেছেন জীবনের মাঠে।
এই জয় নতুন দিশা দেখাক তাঁদের, যারা শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও তাচ্ছিল্যের ভয়ঙ্কর দেয়াল পেরিয়ে বাঁচার মতো আলো খুঁজছেন।
পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক, মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা যতই চলুক—যদি কেউ চেষ্টা না ছেড়ে দেয়, তবে সে অবশ্যই জিতবে।
চোখের আলো নেই তবু অন্তরের আলোয় দেখা—এই সত্যটাই প্রমাণ করলেন ভারতের দৃষ্টিহীন মেয়েরা। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা—সব দলকে হারিয়ে তাঁরা নিয়ে এলেন Women’s Visually Impaired T-20 Cricket World Champion Trophy 2025।
হ্যাঁ, আমরাও পারি। আজ এটাই ওরা প্রমাণ করে দিল।
অভিনন্দন ভারতের মেয়েরা। নতুন বছরে তোমরাই আমাদের অনুপ্রেরণা।