প্রথম পাতা প্রবন্ধ ‘জয় হিন্দ’-এর জন্মকথা: নেতাজি ও আবিদ হাসানের বিস্মৃত ইতিহাস

‘জয় হিন্দ’-এর জন্মকথা: নেতাজি ও আবিদ হাসানের বিস্মৃত ইতিহাস

114 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

ইতিহাসের বহু অধ্যায় আজও আমাদের কাছে অজানা। তেমনই এক অজানা অধ্যায়ের সময়কাল ১৯৪১ সাল। সেই সময় ভারতবর্ষ ছেড়ে আন্তর্জাতিক স্তরে পরাধীন দেশের স্বাধীনতার জন্য বিশ্বজনমত গড়ে তোলার কাজে এবং সামরিক ও অসামরিক নানা প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

ঠিক সেই সময় ইউরোপের জার্মানির কানিসবার্গের একটি জেলখানার বিশাল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল এক জনসভা। সেখানে উপস্থিত বিপুল জনসমুদ্রের সামনে নেতাজী তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণে পরাধীন ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠ, বজ্রকঠিন শরীরী ভাষা এবং আপসহীন নেতৃত্ব উপস্থিত সকলকে দেশমাতৃকার জন্য উদ্বেলিত করে তুলেছিল।

সেই ভিড়ের মধ্যেই উপস্থিত ছিলেন এক তরুণ— আবিদ হাসান সাফরানি। নেতাজীর ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে সেদিনই তিনি স্থির সিদ্ধান্ত নেন, জন্মভূমি ভারতের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবেন।

নেতাজির বক্তৃতা শেষে আবিদ হাসান তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জানান, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করে তিনি দেশের কাজে যোগ দিতে চান। উত্তরে নেতাজী কঠোর স্বরে প্রশ্ন করেন— “কোনটা বড়? দেশের সেবা, না ইঞ্জিনিয়ারিং?” এই একটি প্রশ্নই বদলে দেয় আবিদের জীবনপথ। তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নেতাজীর আন্দোলনে যুক্ত করেন।

পরবর্তীকালে আবিদ হাসান হয়ে ওঠেন নেতাজীর সচিব ও দোভাষী। জার্মানি থেকে সাবমেরিনে নেতাজির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাত্রার সঙ্গীও ছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে তিনি নেতাজীর অন্যতম বিশ্বস্ত সহচর হয়ে ওঠেন।

আজাদ হিন্দ ফৌজে তখন পারস্পরিক সম্ভাষণে ধর্মভিত্তিক শব্দ ব্যবহৃত হতো— কেউ বলতেন “নমস্তে”, কেউ “সালাম ওয়ালেকুম”, কেউ “সৎশ্রী অকাল”। নেতাজি উপলব্ধি করেন, এতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রেশ থেকে যায়। তিনি চান এমন একটি সর্বজনগ্রাহ্য সম্ভাষণ, যেখানে ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের কোনও ছাপ থাকবে না।

নেতাজির নির্দেশে আবিদ হাসান নতুন সম্ভাষণের প্রস্তাব দেন— “জয় হিন্দুস্তান”, সংক্ষেপে “জয় হিন্দ”। ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আসা সেনারা সেই দিন থেকেই একে অপরকে “জয় হিন্দ” বলে সম্ভাষণ করতে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা আজাদ হিন্দ ফৌজে। জন্ম নেয় এক ঐতিহাসিক ধ্বনি— “জয় হিন্দ”

পরবর্তীকালে এই “জয় হিন্দ” স্বাধীন ভারতের সর্বজনবিদিত জাতীয় সম্ভাষণে পরিণত হয়। যার ভাবনাপ্রসূত উদ্ভব ঘটেছিল আবিদ হাসান সাফরানি ও নেতাজীর আদর্শিক চেতনায়।

এরপর ইতিহাস আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখা নেতাজি অন্তর্ধান করেন এক অমীমাংসিত অধ্যায়ে। দেশ স্বাধীনতা পেলেও বিভাজনের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস ভারতের বুকে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে।

১৯৪৬ সালে দিল্লির লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের বিচার হয়। সেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ান আবিদ হাসান সাফরানিও। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি রাজনীতির প্রতি গভীর হতাশা অনুভব করেন, তবে আজীবন নিজের অন্তরে বহন করেন নেতাজী ও সেই অমর ধ্বনি—
“জয় হিন্দ”

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, পরবর্তীকালে নেতাজি ও আবিদ হাসান সাফরানির পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্কও গড়ে ওঠে। নেতাজীর ভাইপো অরবিন্দ বসুর সঙ্গে বিবাহ হয় আবিদ হাসান সাফরানির ভাইঝি সুরাইয়া হাসান সাফরানির।

ইতিহাসের পাতায় এটি এক অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.