এক গভীর নীরবতায় শতবর্ষ পার হয়ে যাচ্ছে বিশ্বমানব সভ্যতার একটি আত্মদর্পণ।
প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়েছিল ১৯২০–২১ সালে। সেই সময়েই নিউইয়র্ক থেকে রবীন্দ্রনাথ একটি picture postcard (Flowing oil well, Shreveport, LA-II) পাঠিয়েছিলেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। রবীন্দ্রনাথ সেই চিত্র বর্ণনা করেছিলেন নানা শব্দবন্ধে— যেমন, “অন্ধকূপ”, “মাথায় উঠছে ধোঁয়া”, “ধোঁয়ায় এরা বিলুপ্ত”, “সূর্যের আলো এদের মানসচক্ষে পৌঁছয় না”। কখনও “পাতালপুরী”, কখনও বা “বলহরণ” বলেও বিবৃত হয়েছে ছবিটির অন্তর্গত ভাবচিত্র।
এরপর ১৯২৩ সালের ১১ই মে রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে একটি চিঠিতে লেখেন— “নাটক গোচের একটা কিছু লিখবার…” ইচ্ছার কথা। আর সেই ইচ্ছার ফলেই রবীন্দ্রসৃষ্টি এক নাটক, যার প্রথম নামকরণ ছিল “যক্ষপুরী”, যা পরে নামাঙ্কিত হয় “রক্তকরবী” নামে।
একটি নাটক— প্রায় এগারো বার সেই লেখাকে চিরে-চিরে খসড়ায় গড়ে তুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, মোট ১১টি পাণ্ডুলিপিতে। যার শুভারম্ভ ১৯২৩ সালের গ্রীষ্মে, শিলং পাহাড়তলীতে। একের পর এক খসড়া লিখতে লিখতে অবশেষে বাংলার ১৩৩১ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ভাদ্র–আশ্বিন সংখ্যায় (১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বর–অক্টোবর) প্রথম “রক্তকরবী” নামে প্রকাশিত হয়।
ঐ একই মাসে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করেন— Red Oleanders শিরোনামে, যা ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘বিশ্বভারতী’ (সেপ্টেম্বর, ১৯২৪) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। পরে এই ইংরেজি অনুবাদটি গ্রন্থাকারে ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, সেই সময়ের ‘নাচঘর’ নামক একটি পত্রিকার ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ভাদ্র–আশ্বিন সংখ্যায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়—
“রবীন্দ্রনাথের সবিশেষ অনুগ্রহে শিশির কুমার ভাদুড়ি তাঁর নূতন ও অপূর্ব নাটক ‘রক্তকরবী’ অভিনয় করার অনুমতি সাপেক্ষে অধিকার পেয়েছেন।”
১৯২৬ সালে “রক্তকরবী” নাটকটি বাংলায় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় “রক্তকরবী” মঞ্চস্থ হয় ১৯৩৪ সালের ৬ই এপ্রিল। এরপর নানা সময়ে বহু কৃতি ও কীর্তিমান মানুষ এই নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কিম্বদন্তি শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্র এই নাটকের পরিচালনা ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহলায় অংশ নিয়েছিলেন খ্যাতিমান ভাস্কর ও চিত্রকর রামকিঙ্কর বেইজ। অভিনয় করেছেন দেবব্রত বিশ্বাস, উমা চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।
অন্য প্রযোজনায় এই নাটকে অভিনয় করেছেন নাট্যজগতের দিকপাল অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রখ্যাত অভিনেতা সন্তোষ দত্ত। সাম্প্রতিক কালে, ২০০৬ সাল থেকে ‘তৃতীয় সূত্র’-এর পক্ষে “রক্তকরবী” পরিচালনা করছেন এই সময়ের অনন্য নাট্যব্যক্তিত্ব সুমন মুখোপাধ্যায়।
শতবর্ষ পেরিয়েও রবীন্দ্রনাথের এই “রক্তকরবী” আজও অতি প্রাসঙ্গিক—এ কথা অনস্বীকার্য।
মানুষের সভ্যতায়, সমাজের পটভূমিতে ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে— যুগে যুগে ক্ষমতার উচ্চতম শৃঙ্গকে নানান অত্যাচার ও প্রবঞ্চনার মাধ্যমে বিদীর্ণ করার চক্রান্ত চালায় ক্ষমতালোভী কিছু প্রধান পদাধিকারী। ক্ষমতার এই মানবিকতা-বিরোধী শঠতার কথাই রবীন্দ্রনাথ “রক্তকরবী” নাটকে বিপ্লব ও প্রতিবাদের চিরাচরিত ভাষ্যে রূপ দিয়েছেন।
শতবছর পার করেও “রক্তকরবী” আজও অনবদ্ধ। আজকের নাগরিক জীবনে আমাদের কাছে পরিচিত একটি বাক্য— “You are under CCTV surveillance…”। ঘরে-বাইরে, প্রতি পদক্ষেপে এক বা একাধিক যান্ত্রিক চোখ আমাদের নজরদারিতে রাখছে। কখনও রাষ্ট্র, কখনও বহুজাতিক কর্পোরেট, কখনও গোষ্ঠী, সঙ্ঘ কিংবা বাজারের মালিক— সর্বত্রই ক্ষমতার এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ।
এই নজরদারির কথাই রবীন্দ্রনাথ “রক্তকরবী”-তে বলেছিলেন একশ বছর আগে।
রক্তকরবীর এগারোটি পাণ্ডুলিপির দিকে তাকালে দেখা যায়, নানা আঁকিবুকির মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে আশ্চর্য সব রূপায়ণ। কোথাও নারী মুখের আদল, কোথাও আদিম যুগের জীবজন্তু, পাখি কিংবা মানুষের অবয়বের ইঙ্গিত। অক্ষরের কাটাকুটির ফাঁকে মনের চোখে ধরা পড়ে এক দানবীয় হিংস্র অবয়ব— লাল, সাদা ও মেটে বাদামির মিশ্রণে প্রকাশ পায় ক্ষমতার কদর্য রূপ।
এই ক্ষমতা মানুষকে ব্যক্তিসত্তা থেকে সরিয়ে কেবল সংখ্যা বা পদনামে রূপান্তরিত করে। সেই দুর্বৃত্ত, সেই রাক্ষস, সেই শয়তানকে রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষ আগেই স্পষ্ট করে চিনিয়ে দিয়েছিলেন “রক্তকরবী”-র মাধ্যমে।
১৯২৪ সালে জাপানে শিক্ষাবিষয়ক এক অভিভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—
“আমরা জেলখানার জন্য বন্দি জোগাড় করি, পাগলাগারদের জন্য রোগী আনি; তেমনই আমরা শিশুদের মনকেও ফাটকের মধ্যে বন্দি করে ফেলছি, ভেঙে দিচ্ছি তাদের অন্তর্লীন ক্ষমতা।”
নীরবে পার হয়ে যাওয়া শতবর্ষ অতিক্রম করে “রক্তকরবী” আজও আমাদের আত্মসমীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার অন্তরালের নজরদারিতে শৃঙ্খলিত হয়— এ এক ভয়াবহ বিভৎসতা। মানুষের চেতনায় আত্ম-আবিষ্কার ও আত্মবীক্ষণের যে নাটক, সেটিই রবীন্দ্রনাথের “রক্তকরবী”।
নন্দিনী ডাক দিয়ে যায়—
“রাজা, শুনতে কি পাচ্ছো? ঐ দেখো, দূর থেকে মানুষের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর… জানি, তুমি ভয় পেয়েছ। তাই এক বিশাল আড়াল তৈরি করে তার অন্তরালে থেকে নজরদারি করছ। কিন্তু কতজনের উপর নজর রাখবে? কতদিন পারবে? সংখ্যায় ওরা অনেক… একদিন তোমার এই আড়াল ভেঙে তোমাকে বেরিয়ে আসতেই হবে। শেষ কথা তুমি বলবে না— শেষ কথা বলবে নিয়তির অমোঘ বিধান।”
এই শতবর্ষে “রক্তকরবী” তাই আজও আমাদের চেনা, আমাদের সময়ের প্রাসঙ্গিকতার এক অনিবার্য দলিল।