পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্য তো বটেই, সারা বিশ্বের সাহিত্যে হোটেলকে কেন্দ্র করে তার অভ্যন্তরীণ জীবন ও মানুষদের নিয়ে লেখা কাহিনী প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ আমাদের বাংলা সাহিত্যে শহরের বুকে অপরিহার্য এক প্রতিষ্ঠান—হোটেলের ভেতরের নানা ধরনের মানুষ ও তাদের জীবনের গল্পকে কেন্দ্র করে যে কাহিনী একসময় বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তার স্রষ্টা সদ্য প্রয়াত কথাশিল্পী মনিশংকর মুখোপাধ্যায়। তিনি বাঙালি পাঠকের কাছে সাহিত্যিক ‘শংকর’ নামেই অধিক পরিচিত।
অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার বনগ্রাম, যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ নামে পরিচিত, সেখানেই ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর মনিশংকর মুখোপাধ্যায়ের জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন আইনজীবী হরিপদ মুখোপাধ্যায় এবং মা অভয়ারানী মুখোপাধ্যায়।
শৈশবেই মনিশংকরের পরিবার হাওড়ায় চলে আসে। এখানেই তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার শুরু। কিন্তু খুব অল্প বয়সেই বাবার অকাল মৃত্যুতে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। মা ও ছোট ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে গিয়ে তিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
জীবনের প্রয়োজনে নানা পেশায় যুক্ত হতে হয়েছিল তাঁকে। কখনও ফেরিওয়ালা, কখনও টাইপরাইটার পরিষ্কার করার কাজ, কখনও প্রাইভেট টিউশনি, আবার কখনও জুট ব্রোকারের অফিসে কেরানির কাজ—এভাবেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে তাঁর জীবন। এই নানা অভিজ্ঞতাই তাঁকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।
পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডেরিক বারওয়েলের অফিসে কনিষ্ঠ কেরানির কাজ পান। বারওয়েল সাহেবের সুপারিশেই তিনি পরে কলকাতার এক নামী হোটেলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান, যখন বারওয়েল সাহেব ইংল্যান্ডে ফিরে যান।
চাকরির পাশাপাশি লেখালিখির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। হাওড়ার বিবেকানন্দ স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি লেখালিখি শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই ‘কত অজানারে’। প্রকাশের পরই বইটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এরপর একের পর এক কালজয়ী উপন্যাস ও গল্প লিখে গেছেন শংকর। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’ প্রভৃতি। এই কাহিনীগুলি পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রেও রূপায়িত হয়েছে। পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় তৈরি হয় ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্র এবং সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় তৈরি হয় ‘জন অরণ্য’ ও ‘সীমাবদ্ধ’।
জীবনের এক পর্যায়ে শংকর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রীমা সারদা দেবীর জীবন সম্পর্কেও বহু অজানা তথ্য ও কাহিনী সাহিত্যরূপে তুলে ধরেন। যা বাঙালি পাঠকের কাছে এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে রয়েছে।
শহরের কথক হিসেবে শংকর লিখে গেছেন মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের নানা গল্প থেকে শুরু করে কর্পোরেট জগতের অজানা দিকের কথাও। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে শহুরে জীবনের নানা বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা।
২০১৬ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্যিক শংকরকে ডি.লিট্ সম্মানে সম্মানিত করে। ২০১৯ সালে তিনি কলকাতা মহানগরের শেরিফ পদে নিযুক্ত হন। ২০২০ সালে তাঁর ‘একা একা একাশি’ বইটির জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
প্রায় ছয় থেকে সাত দশক ধরে বাংলা সাহিত্যের সেবায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন তিনি। অসংখ্য গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখে গেছেন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর বহু বইই পাঠকদের কাছে বাণিজ্যিকভাবে বেস্টসেলার হয়ে উঠেছিল।
অবশেষে নিয়তির অমোঘ বিধানে ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কথাশিল্পী মনিশংকর মুখোপাধ্যায় তথা ‘শংকর’ পাড়ি দিলেন অজানার দেশে।
আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে প্রকাশিত ‘কত অজানারে’-র সেই লেখকের মহাপ্রস্থানে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা— “চরণ ছুঁয়ে যাই।”