তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় রাজভবনে অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুত থাকার যে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছিলেন, তা ঘিরে অবশেষে আইনি পদক্ষেপ নিল রাজভবন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজভবনের তরফে জানানো হয়েছে, রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসকে লক্ষ্য করে ‘আক্রমণাত্মক ও মিথ্যা’ মন্তব্যের জেরে কল্যাণের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস) ২০২৩-এর একাধিক গুরুতর ধারায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে দেশের ঐক্য ও সংহতির প্রতি আঘাত, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা, ঘৃণা ছড়ানো, হিংসায় উস্কানি দেওয়া এবং রাজ্যপালের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা— যেগুলি অ-জামিনযোগ্য এবং দোষী প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। রাজ্যপালের অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি (ওএসডি)-র পক্ষ থেকে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে বলে রাজভবন জানিয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জনসমক্ষে এমন মন্তব্য করেছেন যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, বিভ্রান্তি এবং অরাজকতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। রাজভবনের দাবি, সাংবিধানিক পদমর্যাদায় থাকা রাজ্যপালের সম্মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার উপর সরাসরি আঘাত হয়েছে। অভিযোগে যে সব ধারার উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বিএনএসের সেকশন ১৫১ ও ১৫২ (দেশের ঐক্য-সংহতির প্রতি হুমকি), ১৯৭ (ভুল তথ্য ছড়িয়ে হিংসা উস্কে দেওয়া), ১৯৬A ও ১৯৬B (সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট ও ঘৃণা ছড়ানো), ৩৫৩-১B ও ৩৫৩C (সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো ও রাজ্যপালের ভাবমূর্তি নষ্ট করা), ৩৫৩-২ (ভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে হিংসা উস্কে দেওয়া) ইত্যাদি। রাজভবনের বক্তব্য, কল্যাণের অভিযোগ যে রাজভবনে নাকি অস্ত্র, বোমা ও গোলাবারুদ মজুত রয়েছে— তা ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর অনাস্থা সৃষ্টি হতে পারে।
ঘটনার সূত্র শনিবার। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর)-কে সমর্থন জানিয়ে রাজ্যপাল বিবৃতি দেওয়ার পরই শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ মন্তব্য করেন— “রাজ্যপাল বিজেপির অপরাধীদের রাজভবনে আশ্রয় দিচ্ছেন, তাঁদের বন্দুক-বোমা দিচ্ছেন এবং তৃণমূলকর্মীদের উপর হামলার নির্দেশ দিচ্ছেন।” এর পরই রাজভবন পাল্টা বিবৃতিতে সেই অভিযোগ অস্বীকার করে। তবে কল্যাণ আবারও রাজ্যপালকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন।
সোমবার উত্তরবঙ্গ থেকে সফর মাঝপথে বাতিল করে রাজ্যপাল কলকাতায় ফিরে আসেন এবং পুলিশের আধিকারিক, কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য, বম্ব স্কোয়াড ও স্নিফার ডগ-সহ বিশাল নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে রাজভবন চত্বরে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেন। তল্লাশি পর্ব সরাসরি সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পরিচালিত হয়। দীর্ঘ তল্লাশির শেষে রাজ্যপাল জানান, রাজভবনে কোনও আপত্তিকর বা সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি এবং তৃণমূল সাংসদের উচিত অবিলম্বে প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া। সোমবারই রাজভবনের আইনজীবীদের হাই কোর্টে মামলা করার প্রস্তুতি শুরু করতে বলা হয়েছিল। সেই নির্দেশ অনুযায়ী মঙ্গলবার কলকাতা হাই কোর্টে শ্রীরামপুরের সাংসদের বিরুদ্ধে রাজভবন আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে।