প্রথম পাতা খবর ভালোবাসা হলো প্রকৃতির সূর্য: ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র জন্ম কথা

ভালোবাসা হলো প্রকৃতির সূর্য: ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র জন্ম কথা

17 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব “ভালোবাসা” নিয়ে নানান সাহিত্য, গান, কবিতা লিখে গেছেন। নানান ইতিহাস রচিত হয়েছে।

মানুষের সভ্যতার আদিম লগ্ন থেকেই মানুষের অন্তরের শ্রেষ্ঠ অনুভূতির নামই হলো ভালোবাসা।

যুগে যুগে নারী–পুরুষের পারস্পরিক মনের এই অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়েছে ইতিহাস এবং বিভিন্ন ঘটনাবলি। ভালোবাসার অনেক নাম, অনেক রূপ, ভালোবাসার অনেক সম্পর্ক। এই ভালোবাসার কথা নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই অবধারিতভাবে এসে পড়ে “ভ্যালেন্টাইন্স ডে” বা ভালোবাসার একটি প্রতীকী দিনের ইতিহাসের কথা।

কথিত আছে, খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে ইতালির রোম শহরের এক গির্জার একজন ক্যাথলিক যাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের কথা। এই উদারচেতা মানুষটি তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের একটি অমানবিক নিষেধাজ্ঞা— কোনও নারী–পুরুষ নিজেদের পছন্দের আতিশয্যে পরস্পর ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করতে পারবে না। পুরুষ শুধু সম্রাটের আজ্ঞাবহ সৈনিক হবে, যুদ্ধ করবে, ঘরবাড়ি ছেড়ে মরতে হলে মরবে। আর নারীরা সম্রাটের ক্রীতদাসী হয়ে থাকবে, তার মনোরঞ্জন করার জন্য। এই চরম অন্যায় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস সেই সময়ে কারও ছিল না। কিন্তু সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, তাই তিনি এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং সেই সময়ের অনেক প্রেমিক–প্রেমিকাকে গোপনে সাহায্য–সহযোগিতা করতেন। তিনি গির্জায় আগত সমস্ত মানুষকে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার উপদেশ দিতেন, উপদেশ দিতেন অসহায় অবলা প্রাণীদের ভালোবাসার জন্য। কারণ মানব জীবনের পরম পবিত্র পুণ্য হলো সহিষ্ণু হওয়া এবং ভালোবাসায় নিজের অন্তরকে মথিত করা, সিক্ত করা।

কিন্তু যতই গোপনীয়তা থাকুক, সম্রাটের গুপ্তচররা ছিল চারদিকে। তাদের মাধ্যমে সম্রাট ক্লডিয়াসের কাছে এই সংবাদ যেতেই সম্রাট সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে প্রকাশ্য দিবালোকে চাবুক মারতে মারতে কারাগারে বন্দী করার আদেশ দেন। কিন্তু কেউ সেই আদেশ মানতে চায়নি, কতিপয় দাসানুদাস ছাড়া।

যাই হোক, এক সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের পিঠে চাবুক মারতে মারতে তাকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।

সেই কারাগারের রক্ষপাল (জেলার) ছিলেন গ্লেনাস আন্টোনিও। তিনি খুব দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, কিন্তু তার মনে গভীর একটি দুঃখ ছিল। সেই দুঃখ হলো, তার একমাত্র কন্যা সিসিলিয়া কিশোরী বয়সে এক অসুখের কারণে আজ অন্ধ হয়ে গেছে। সুন্দরী, সর্বগুণসম্পন্না সেই সিসিলিয়ার জন্য বাবা গ্লেনাস আন্টোনিওর মনে কোনও শান্তি নেই।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কথায় কথায় বিষয়টি জানতে পারেন গ্লেনাসের কাছ থেকে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন অনেক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলেন। সেই বিশ্বাসে এবং আস্থায় গ্লেনাস সবার আড়ালে নিজের অন্ধ মেয়েকে সারিয়ে তোলার জন্য তাকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের কাছে নিয়ে আসতেন। অবশেষে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের দ্বারা তরুণী সিসিলিয়া আবার তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। বাবা–মেয়ে দুজনেই খুশিতে ভরে ওঠেন। সিসিলিয়া ভালোবেসে ফেলেন মধ্যবয়সি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে। ভ্যালেন্টাইনও নিজের প্রাণের চেয়েও সিসিলিয়াকে ভালোবাসতেন। তাদের এই ভালোবাসার আদান–প্রদান চলতে থাকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে।
কিন্তু একদিন সেই ঘটনার কথা গুপ্তচর মারফত সম্রাট ক্লডিয়াসের কানে যায়। সম্রাট তৎক্ষণাৎ সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের শাস্তি হিসেবে রোম নগরীর প্রকাশ্য রাস্তায় তার শিরোচ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এই আদেশ দেওয়ার তারিখ ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি, ২৭০ খ্রিস্টাব্দ। বন্দী এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মনে কিন্তু এতটুকু ভয় বা কষ্ট কিছুই ছিল না। তিনি কারাগারে বসে লিখতে থাকেন চিঠি, তাঁর প্রেয়সী সিসিলিয়াকে পাঠানোর জন্য। সেই সময়ে সারা রোমে মানুষ ভীষণভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সম্রাটের পোষা সেনাদের ভয়ে কেউ কিছু বলতে বা প্রতিবাদ করতে পারেনি।

অবশেষে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রোমের রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে সকালবেলা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের দেহ থেকে তার মাথাটি বিচ্ছিন্ন করা হয় সম্রাটের তরবারির আঘাতে। সেদিন সারা রোমের মানুষ অভিশাপ দিয়েছিল ক্লডিয়াসকে। আর আশ্চর্যের বিষয়, সেদিনই যখন সম্রাট ক্লডিয়াস আর তার পোষা সেনারা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের হত্যার আনন্দে মশগুল, ঠিক তখনই এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসে রোমের ওপর। প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ঘন ঘন বজ্রপাতে কেঁপে উঠছিল সারা রোম। আর সেই অকস্মাৎ বজ্রপাতেই সম্রাট ক্লডিয়াসের মৃত্যু ঘটে।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন মৃত্যুর আগে প্রেমিকা সিসিলিয়াকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটি পরে কারাগারের এক রক্ষী বাত্তিলোচি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের প্রেমিকা সিসিলিয়াকে দেয়। তাতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন লিখেছিলেন— “Te iubesc” (তে ইউবেস্ক) / আমি তোমাকে ভালোবাসি। “Te ador” (তে আদোর) / আমি তোমাকে আরাধনা করি। “Esti totul pentru mine” (এস্তি তোতুল পেনত্রু মাইন) / তুমি আমার সবকিছু।
কথিত আছে, সিসিলিয়া এই চিঠিটি পড়ার পরই শোকে পাথর হয়ে যান এবং সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান। সে এক অনন্যসাধারণ করুণ ইতিহাস।

রোমান যাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসার জন্য এই আত্মবলিদানের ইতিহাস ও স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ সেন্ট জিলাসিউস ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি এই সাত দিন পবিত্র, পুণ্য ভালোবাসার সপ্তাহ হিসেবে “ভ্যালেন্টাইনস পিরিয়ড” ঘোষণা করেন, আর ১৪ ফেব্রুয়ারির দিনটি “ভ্যালেন্টাইনস ডে” হিসেবে পালন করার আহ্বান জানান সারা বিশ্বের মানুষের অন্তরে সহিষ্ণুতা ও ভালোবাসার শাশ্বত আলোর সন্ধানে। যে ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকবে সব বয়সের মানুষ, সব সম্পর্কের মানুষ, সব জাতের মানুষ, সব ধর্মের মানুষ—পরস্পর পরস্পরকে।
তাই ভ্যালেন্টাইন্স ডে আমাদের কাছে এক অনন্যসাধারণ, পরম পবিত্র দিন।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.