সপ্তসিন্ধু–মহাসাগরের তলাতল পাওয়া, অসীম দিগন্ত-বিস্তৃত মহাকাশের সীমানা খুঁজে পাওয়া—বোধহয় সহজে মেলে না। তা জানা যায় শুধু ধারাবাহিক চর্চা, অভিজ্ঞতা আর আবিষ্কারের মাধ্যমে। অনুভবে, অনুসন্ধিৎসায়।
ঠিক তেমনই পরমপুরুষ শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবন-লীলার বহু অজানা ঘটনা ভক্তজনের মুখে মুখে, পরম্পরায় অনুসন্ধিৎসার মধ্য দিয়ে পাওয়া যায়। যা আমাদের ভাবায়; আমাদের চিন্তা-ভাবনার উত্তরণ ঘটে। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাথে সেই যুগের ইসলাম-সম্পর্কিত কাহিনী সম্পর্কেও অনেক অজানা তথ্য জানা যায়। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগের (১১ই অক্টোবর, ১৯৯৬ / ১লা জানুয়ারি, ১৯৯৭) একটি প্রবন্ধ “আমাদের গদাই ঠাকুর” এবং “উমেদ আলি”–শিরোনামে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা শুধু চমকপ্রদই নয়—তা বলা যায় জ্ঞান ও গরিমার এক অনিন্দ্যসুন্দর প্রত্যয়।
ঠাকুরের পুণ্য-পবিত্র জন্মভূমি কামারপুকুরের পড়শি গ্রাম ছিল মান্দারণ। সেই গ্রামে ঠাকুরের প্রায় সমবয়সী বাল্যসুহৃদ উমেদ আলি থাকতেন। সেই উমেদ আলিই শ্রী রামকৃষ্ণদেবের বাল্যকালের সঙ্গী ছিলেন। উমেদ আলির জীবনের অভিজ্ঞতা তিনি বলেছিলেন তাঁর ৮৫/৯০ বছর বয়সে—উমেদ আলির নাতির পুত্র (পুতি) শেখ আবদুল মালেকের কাছে। তখন আবদুল মালেকের বয়স ছিল ১৫/১৬। সেই আবদুলের কাছ থেকে উমেদের সেই কাহিনী শোনা যায় প্রায় ৭০/৭২ বছর পরে—১৯৯৪/৯৫ সালে।
উমেদ আলি বলেছিলেন—“রামকৃষ্ণ ঠাকুরকে আমরা বলতাম গদাই ঠাকুর। সে অনেক কালের কথা। গদাই ঠাকুর আমার কাছে স্যাঙাতের সর্দারের মতো ছিলেন। বয়সে আমার চেয়ে বছর পাঁচ-ছয়েক বড় হবেন। তাঁর সাথে আমার প্রথম দেখা হয় গড়বেতায়। তখন দু’জনেই ছেলেমানুষ।” (আলি–৪, পৃ. ৩১৭/৩২০, আমাদের গদাই ঠাকুর)
উমেদ আলির বলা ঘটনা থেকে জানা যায়—শ্রী রামকৃষ্ণ একবার ঈদুজ্জোহার সময় ঈদের জামাতে সমবেত নামাজে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। ঘটনাটির বর্ণনা পাওয়া গেছে—
“গদাই ঠাকুরের দিলের মাপ করা কঠিন। এতটুকু সংস্কার দেখিনি তাঁর মধ্যে। মানুষ যে এত উদার হয়, গদাই ঠাকুরকে না দেখলে ভাবতামই না। আল্লার কী দয়া! তাঁকে দেখলেই মনে হতো তিনি যেন স্বয়ং আল্লাহর দুত। মুন্সীসাহেবের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তাঁকে কোরানের ব্যাখ্যা শুনতে দেখেছি। একবার তো গদাই ঠাকুর বলেছিলেন— ‘আমার খুব ঈদের নামাজ দেখতে ইচ্ছে। এই তো সামনেই ঈদুজ্জোহা। দেখিস, ঠিক মান্দারণের ঈদগাহে ঐদিন হাজির হব।’ আমি ভেবেছিলাম—হয়তো রসিকতা করছেন। কিন্তু সত্যসত্যই ঈদের দিন তিনি ঈদগাহে হাজির হয়েছিলেন।”
(ঐ / স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ)
সেই সময়ে গ্রাম্য এলাকাতে মুসলমানদের সঙ্গে সখ্যতার কারণে গ্রামের ও পাশের গোঁসাইরা, কট্টর হিন্দুরা গদাধরকে ব্যঙ্গ করতেন। ঠাকুরের বাল্যবন্ধু উমেদ আলির কথা থেকে জানা যায়—
“শুনেছি, গদাইকে শ্রীপুরের গোঁসাইরা ব্যঙ্গ করে বলতো—‘গদাইটা নেড়েদের ঘরে যায়; ওর জাতপাত বকে গেছে, কিছু নেই; ও ম্লেচ্ছ।’ অবশ্যি গাঁয়ের ঐসব টিকিধারী বামুনদের—কি গোঁড়া মুসলমানদের—গদাই ঠাকুর পাত্তাই দিতেন না। বলতেন—‘ওরা সব ছোট-ঠাকের লোক। কুয়ার ব্যাঙ—ভাবছে জগৎটা একটা বড় কুয়ো। জগৎ কার রে বাপ?’”
(ঐ / পৃ. ৩১৮)
একবার পীরের মেলা দেখার প্রসঙ্গে উমেদ আলি স্মৃতি থেকে বলেছিলেন—
“গদাই ঠাকুরের একবার ইচ্ছে হয়েছিল পীরের মেলা দেখার। কামারপুকুরের পাশেই আমডোবা গাঁয়ের কাছে আশালহরি গাঁয়ে বড় পীরের মেলা হতো তখন। কত দূর দূর দেশ থেকে ফকির-দরবেশরা আসতো সেই মেলায়। গদাই শুনেছিলেন—ঐ মেলায় নাকি ফকির-দরবেশদের ভিড় লেগে যায়। আমাকে ধরে বসলেন—সঙ্গে যেতে হবে। গেলাম। গিয়ে দেখি—ফকির-দরবেশদের দলে ভিড়ে গেল গদাই ঠাকুর। তারপর দেখি, তাঁর দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। পীরের গান হচ্ছিল; আর গদাই তন্ময় হয়ে শুনছিলেন। তাঁর কান্নায় ভিজে যাচ্ছে বুক। অনেক কষ্টে তাকে নিয়ে সে যাত্রায় ঘরে ফিরি। পরে জিজ্ঞেস করায় বললেন—‘ফকিরদের গান শুনতে শুনতে মনে হলো—আমরা কত্তো ছোট বুদ্ধি নিয়ে থাকি রে! কত ভেদবিচার করি! আসলে তো সবই মাটি। প্রাণ চলে গেলে কারই বা পুকুর-ডাঙা? কোনটা গোরের মাটি, কোনটা শ্মশানের মাটি—সব একাকার।’”
(পৃ. ৩১৯ / ঐ / স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ)
আরেকটি স্মৃতিতে উমেদ আলি জানিয়েছেন—
মান্দারণের মিয়াঁরা ছিলেন খুব ধনী। তাদের সঙ্গেও গদাই ঠাকুরের দহরম-মহরম ছিল। পরে তারা কলকাতায় ব্যবসা করতে গিয়ে দক্ষিণেশ্বরে গদাই ঠাকুরের কাছে যেতেন। একবার তাদের ঘরে ও ধানের-খড়ের গাদায় আগুন লেগে সব ছাই হয়ে যায়। সে বিপদের মধ্যে বাড়ির কত্তা স্বপ্নে দেখেন—আল্লাহর একজন দুত বলছেন—
“তোদের সংসারে অমঙ্গল ঢুকেছে। তোরা সত্যপীরের সিন্নি মানত কর। কামারপুকুরের গদাই ঠাকুরকে দিয়ে সিন্নি দে পীরের তলায়—সব ঠিক হবে।”
কত্তা মিয়াঁ আমাকে ডেকে বললেন। তখন গদাই কামারপুকুরে। আমি গেলাম তাঁকে আনতে। প্রথমে আসতে চাইছিলেন না। বললেন—
“আল্লা বলেছেন—তা হিন্দুদের মতো পুরুত-ফুরুত, মোল্লা-ফোল্লা ডাকছো কেন? নিজেরাই আল্লার কাছে যাও। তিনি দয়াময়, রহমত। ঠিক রক্ষা করবেন।”
তবু শেষে এসেছিলেন। মিয়াঁরা খুব খুশি হন। গদাই সিন্নি দেন পীরের দরগায়। দীর্ঘক্ষণ থাকেন। সিন্নি খান, আনন্দ করেন, আল্লার কথা বলেন, ধর্মের মর্মকথা বোঝান—যা বড় বড় মৌলবীরাও বুঝিয়ে বলতে পারেন না।
শেষ স্মৃতিতে উমেদ আলি বলেন—
“গদাই ঠাকুর সত্যি সত্যিই পীর। কেউ বলেন হিন্দু সাধক; আমি বলি—তিনি আল্লার দুত। খোদাতাল্লাই তাঁকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তা না হলে ইসলামের প্রতি তাঁর এত মমতা কেন? কী উদার দিল! কী জ্ঞান! থই পাওয়া দায়—কিন্তু কী সহজ করে বোঝান সব। বড় দুনিয়ায় পাওয়া যায় না। গদাই ঠাকুরের মুখে শুনতাম—‘কুয়ার ব্যাঙ হবি না। হবি আকাশের পাখি। যেমন খুশি উড়বি, যেমন খুশি যাবি। ঘরের চাল খুব নিচু করে রাখলে বর্ষায় জল কাটে ঠিকই, কিন্তু আলো-বাতাস ঢোকে না। তাই একটু উঁচুতে রাখাই ভালো—জলও কাটবে, আলো-বাতাসও ঢুকবে।’
“আমি গদাই ঠাকুরকে দেখেছি ছোট ছাওয়াল বয়স থেকে অনেকদিন। রাখাল, সাঁওতাল, মজুর, কলু, মুচি-মেথর, মুদ্দফরাস, মুটে, হিন্দু-মুসলমান—সবাই ছিল তাঁর আপনজন। গদাই ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ যেমন—তেমনই আমাদের আল্লাতালার দুত, যেন পয়গম্বর, আল্লার রসুল।”
(ঐ / পৃ. ২০–২১)
আল্লার দোয়ায়, ঈশ্বরের দয়ায় বেঁচে থাকুক আমাদের অন্তরে অন্তরে—শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বাল্যবন্ধু প্রণম্য উমেদ আলি সাহেবের বিশ্বাসের মতোই আমাদের সকলের বিশ্বাসের পবিত্রভূমি।