পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
এখনও বাজছে সেই গানটি সরস্বতী পুজোর মণ্ডপে—যেন মহাশ্বেতার আরাধনার মধ্য দিয়েই “গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি”-র দর্শন প্রতিস্থাপিত হচ্ছে আগামীর প্রজাতান্ত্রিক দিবস উদযাপনের প্রস্তুতিতে। যে গানটির সৃষ্টি হয়েছিল ১৯০১ সালে—আজ থেকে প্রায় ১২৫ বছর আগে—সেই সময়ের অখণ্ড বাংলা তথা ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল বিশ্বমানব আত্মা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনন ও সৃজনে—
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”
এই গানের সুর রবীন্দ্রনাথ নিয়েছিলেন বাংলা তথা সারা পৃথিবীর অন্যতম প্রিয় মাটির সুর থেকে—বাউল সুর। সেই সুরের উৎস গগন হরকরার গান— “আমি কোথায় পাবো তারে”।
সাম্প্রতিক কালে আমাদের দেশে এবং প্রতিবেশী দেশেও এই ঐতিহাসিক গানটি নিয়ে নানা পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনা, এমনকি অরুচিকর ও অগভীর মন্তব্য শোনা যাচ্ছে—যা গভীরভাবে নীচতার ও হীনমন্যতার পরিচায়ক। এই গান শুধু বাঙালির আবেগ নয়, এই গান একটি দেশের, একটি জাতির রাষ্ট্রীয় সঙ্গীত। (তখনও বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্ম নেয়নি। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন—দেশ যদি স্বাধীন হয়, তবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” গানটিই হবে জাতীয় সঙ্গীত।)
সেদিন লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে আগুন জ্বলে ওঠার মতো মানুষ সেই গান গেয়ে উঠেছিলেন—সে এক অনন্যসাধারণ ইতিহাস।
তবে আজ সেই গান নিয়েই বিরোধিতা? নানা বিধিনিষেধ? কেন? এ কোন দৃষ্টিভঙ্গি?
রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের সময়ে এই গান রচনার জন্য বাউল সুরকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনটি মৌলিক কারণে।
প্রথমত, বাউল গানের সুর সহজ, সরল ও প্রাণবন্ত। এই সুরে রয়েছে মাটির গন্ধ, আত্মার টান—যা অনায়াসেই মানুষের অন্তর স্পর্শ করে।
দ্বিতীয়ত, এই বাউল সুরের মধ্যেই ছিল তৎকালীন সময়ের প্রাসঙ্গিক ঐক্যের সুর—হিন্দু-মুসলমান মিলনের সুর। রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছেন—
“বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি—এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই। একত্র হয়েছে, অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভা-সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়নি, কিন্তু এই মিলনে গান জেগেছে। সেই গানের ভাষা ও সুর কোরান-পুরাণে ঝগড়া বাঁধায়নি… হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে।”
তৃতীয়ত, এই গানের মধ্যে রয়েছে এক মার্জিত, আরোপিত বিদ্রোহ। আরব রাজশক্তির আঘাতের প্রতিঘাত থেকেই জন্ম নেওয়া সুফি মতবাদের সঙ্গে বৌদ্ধ মানবতাবাদের আত্মিক মিলনে যে মরমিয়া ভাবসঙ্গীতের ধারা গড়ে উঠেছে, বাউল সুর তারই উত্তরাধিকার। জাতি-ধর্ম-লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সেই সাধনাই উচ্চারণ করে—
“সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে!
লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে!”
এই ভাবেই “আমার সোনার বাংলা” হয়ে ওঠে জীবনের পরিভ্রমণের শেষে পাওয়া এক পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধির গান। এ গান দেশপ্রেমের, মানবপ্রেমের গান। উগ্র জাতীয়তাবাদ কখনও দেশপ্রেমের জন্ম দেয় না—বরং তা মৌলবাদের দিকে ঠেলে দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফ্রাঙ্কো, হিটলার, মুসোলিনি বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা কখনও দেশপ্রেমিক ছিলেন না।
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী প্রকৃত দেশপ্রেমিক, মানব ও প্রকৃতিপ্রেমী। তাই তিনি নিজেই বলেন—
“বিশ্বভ্রাতার যজ্ঞশালায় আত্ম-হোমের বহ্নি।”
অন্য দেশ, অন্য জাতির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছাড়া নিজের দেশের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা সম্ভব নয়—এই শিক্ষাই তিনি দিয়ে গেছেন।
এই গানের পঙ্ক্তি পঙ্ক্তিতে রয়েছে বাংলা, ভারত তথা বিশ্বের প্রকৃতির নৈসর্গিক রূপ—যেন সৌন্দর্যের আঙিনায় অনুভবের নকশিকাঁথা পাতা।
ইতিহাস জানে, মানবসভ্যতার সমস্ত শুভ শক্তিই বারবার আক্রান্ত হয়েছে উগ্র আগ্রাসনে। কিন্তু সত্য ও মানবতাকে কখনও পরাজিত করা যায়নি। সাময়িক মেঘ ঢাকলেও চিরন্তন সূর্য আবার উদিত হয়—
“তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ
অসতো মা সদ্গময়ঃ
মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়ঃ।”
তাই ১৯৬৭ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। তার আগে ব্রিটিশরাও চেয়েছিল তাঁকে দমিয়ে রাখতে। আজও কোথাও কোথাও তাঁর আলো অসহনীয় হয়ে উঠছে কূপমণ্ডুক রাজনীতির কাছে। সেই কারণেই আক্রান্ত “আমার সোনার বাংলা”।
কিন্তু ইতিহাস বলছে—সমস্ত বিরোধিতাকে ছুঁড়ে ফেলে মানুষ আজও যেমন গাইছে, তেমনই ভবিষ্যতেও গাইবে—
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”