পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী ইউটোপিয়ান উপন্যাস হিসেবে আজও সমাদৃত “Sultana’s Dream”। এর লেখিকা বিংশ শতাব্দীর এক ক্ষণজন্মা বাঙালি নারী— বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০ – ৯ ডিসেম্বর ১৯৩২)।
তদানীন্তন সমাজের কঠোর রক্ষণশীলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক বাঙালি ঘরের মহিলার লেখা এই উপন্যাস নিঃসন্দেহে নারীবাদী সাহিত্যধারার এক অনন্য নিদর্শন। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এটি ধ্রুপদী নারীবাদী কল্পকাহিনির এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত।
যে সময়ে তিনি এই উপন্যাসটি লিখছেন, তখনকার সামাজিক ও ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব ছিল অত্যন্ত কঠোর ও রক্ষণশীল। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই সাহিত্যকর্ম নিঃসন্দেহে এক দুঃসাহসী এবং বৈপ্লবিক সৃষ্টি।
সমাজব্যবস্থার কারণে তিনি প্রথাগত শিক্ষালাভ করতে না পারলেও তাঁর আধুনিকমনস্ক বড়দাদা তাঁকে গোপনে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও আরবি ভাষা শেখাতেন। পরে তাঁর স্বামী সাখাওয়াত হোসেনও ছিলেন মুক্তমনা; তিনিও রোকেয়াকে লেখাপড়া ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দিতেন।
সেই সময় কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে বাঙালি মেয়েদের—হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের—স্কুলে যাওয়ার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই অন্ধকার সময়েই আড়ালে-অন্তরালে নারীশিক্ষা প্রসারে উদ্যোগী হয়েছিলেন রোকেয়া।
প্রথমে ভাগলপুরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে একটি স্কুল শুরু করেন তিনি। পরে স্বামীর মৃত্যুর পর কলকাতায় চলে এসে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন “সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল”—যা আজও নারীশিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
খুব কাছ থেকে তিনি দেখেছিলেন নানা বর্ণ ও ধর্মের নিপীড়িত, নির্যাতিতা ও সমাজ দ্বারা অবহেলিত নারীদের দুঃখের জীবন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। রক্ষণশীলতার অন্ধকার ভেঙে তিনি মুসলিম ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়ের নারীদের প্রগতির কথা দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন।
“Sultana’s Dream” ছাড়াও তিনি লিখেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা— যেমন “পিপাসা” (১৯০২), “মতিচুর” (১৯০৪), “অবরোধবাসিনী” (১৯৩১) প্রভৃতি।
তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “স্ত্রীজাতির অবনতি”-তে তিনি লিখেছিলেন—
“আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কী রূপে?”
রোকেয়ার দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল নারীশিক্ষা এবং সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন। এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন যে তাঁর ভাবনার প্রেরণার উৎস ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, আর সমাজসেবার পথে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ভগিনী নিবেদিতা-র জীবন থেকে।
নারীজাগরণের এই অগ্রদূতীর জন্মের ১২৫ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা অনেক সময়ই ভুলে যাই সেই রোকেয়াকে, যিনি নারীকে আত্মবিকাশ ও সংস্কারমুক্তির পথে এগিয়ে দেওয়ার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছিলেন।