প্রথম পাতা প্রবন্ধ পুঁথি থেকে ই-বুক: বইয়ের বিবর্তন, ধ্বংসের ইতিহাস আর কলকাতা বইমেলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

পুঁথি থেকে ই-বুক: বইয়ের বিবর্তন, ধ্বংসের ইতিহাস আর কলকাতা বইমেলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

21 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

মুখের ভাষা যখন চিহ্ন বা অক্ষরের হাত ধরে লিখিত রূপ পেল, তখন মানুষ তার সভ্যতায় বিস্ময়কর এক শক্তির সন্ধান পেল। তৈরি হল ভাষা—অক্ষর ও শব্দের মিলিত শরীরে কথার লিখিত রূপ। প্রথমে শিলাখণ্ডে, পাথরের গায়ে; তারপর তালপাতা, ভূর্জপত্র, তুলট কাগজে হাতে লেখা বই। এরপর কাঠ ও ধাতুর ব্লকের মাধ্যমে ছাপা হল বই। আধুনিক সময়ে এল কম্পিউটার, ল্যাপটপ—আর আজ ই-বুক। পাশাপাশি রয়েছে ক্যালিগ্রাফি বা সুন্দর হস্তলিপিকরণ—হাজার বৈচিত্র্যের সম্ভার।

প্রাচীন কালের পুঁথি থেকে বিবর্তনের পথে আজকের ই-বুক ও ই-ম্যাগাজিন—বইয়ের এই যাত্রা সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুগে যুগে মানুষের জ্ঞানের আধার এই বই যেমন সমাদৃত হয়েছে, তেমনই বহিঃশক্তির আক্রমণে ধন-সম্পত্তি, জমি, নারীর মতো বইও লুঠ ও ধ্বংস হয়েছে। তার প্রমাণ—নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়–এর পাঠাগারের লক্ষ লক্ষ পুঁথির ধ্বংস।

বইয়ের ইতিহাসে এক বিপ্লব ঘটান ১৪৫০ সালের দিকে জার্মানির মাইনৎস শহরের জোহানেস গুটেনবার্গ। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যায়, ১১শ শতকেই চীনের বি শেং পোড়ামাটির মুভেবল টাইপ উদ্ভাবন করেছিলেন। পরে কোরিয়ায় ব্রোঞ্জের হরফও তৈরি হয়। গুটেনবার্গের হরফ তৈরি হত টিন, অ্যান্টিমনি ও সিসা দিয়ে।

এই প্রেক্ষিতেই বিল গেটস বলেছিলেন—
“Gutenberg’s invention of the printing press brought about the first real shift in distribution friction…”

আজ ছাপাখানার পাশাপাশি ‘প্রিন্ট অন ডিমান্ড’-এর যুগ। তবু ই-বুকের প্রসারের মধ্যেও ছাপা বইয়ের কদর কমেনি। শিল্পবিশেষজ্ঞ হাইঞ্জ বার্গহান্স মত দেন—ডিজিটাল শব্দে স্থায়িত্বের সেই গভীরতা নেই, যা মুদ্রিত অক্ষরে থাকে।

মানুষ স্বভাবতই বইয়ের আগ্রহী পাঠক। বাঙালির ক্ষেত্রেও তার প্রমাণ অসংখ্য। স্বামী বিবেকানন্দ অল্প সময়ে একাধিক বই পড়ে শেষ করতেন। কাজী নজরুল ইসলাম-এর তিন সঙ্গী—তানপুরা, বই ও পানের খিলি। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর জীবনে বই ছিল ছায়াসঙ্গী।

১৩০২ বঙ্গাব্দের ১৬ই অগ্রহায়ণ, পূর্ণিমার দিনে তিনি লেখেন “পূর্ণিমা” কবিতা। পরে ঔপন্যাসিক প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়-কে লেখা এক চিঠিতে কবি জানান, ডাউডেনের সমালোচনা পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে বই বন্ধ করে বাতি নেভাতেই পূর্ণিমার আলো নৌকা ভরিয়ে দেয়—আর সেখান থেকেই কবিতার জন্ম।

বইয়ের এই বৈচিত্র্য ও বৈভবকে সামনে রেখেই আয়োজিত আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। ৪৯তম বর্ষ পেরিয়ে আগামী বছর পূর্ণ হবে সুবর্ণজয়ন্তী। বইমেলা শুধু বাণিজ্য নয়—এটি বাঙালির সংস্কৃতি, স্মৃতি ও জ্ঞানচর্চার উৎসব।

জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট-এর কথায়—
“হে মানুষ, বই পড়ো—ওটাই তোমার হাতিয়ার।”

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.