পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
নেতাজী যখন বিদেশের মাটিতে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন,তখন নেতাজীরই প্রত্যক্ষ উদ্যোগে এবং উদ্যমে আর প্রেরণাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসাবে গঠিত হয়েছিল ঝাঁসী রানী বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যরা প্রায় সকলেই ছিলেন পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মহিলারা, যাঁরা তাদের মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে কোনদিনই দেখেন নি। অথচ,সুভাষচন্দ্র-এর মন্ত্রশিষ্য এই মহিলারা নেতাজীর অনুপ্রেরণাতে নিজেরা দৃঢ়সংকল্পে নির্ভীক ছিলেন সন্মুখ সমরে প্রবল পরাক্রান্ত ব্রিটিশ শত্রুর মোকাবিলা করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য। এটা অবশ্যই উল্লেখ্য যে এইরকম বাহিনি আগে সারা দুনিয়ায় কোথাও গঠিত হয়নি। পৃথিবীব্যাপী ইতিহাসে তাই ঝাঁসী বাহিনী এক অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত।
এবং এটাও সবিশেষ উল্লেখ্যনীয় যে এদেশের নারী আন্দোলনেএই বাহিনির ভুমিকার অনন্যসাধারণ অবদান।
যুগসন্ধিক্ষণের সেই অধ্যায়ে বহুদিন ধরে অবহেলিত,লাঞ্চিত,অবমুল্যায়িত মহিলাদের মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার,আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রয়াসের ইতিহাস। একজন মহিলা নেত্রীর পরিচালনাতে একটি নারী সেনাবাহিনির কাহিনি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায়। যার সাথে মিল রয়েছে ঝাঁসীর রানী লক্ষীবাঈ-এর সেই বীরাঙ্গনা নেতৃত্বের ইতিহাস।
এই বাহিনী ভারববর্ষে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রমাণ দিয়েছিল সমস্ত অত্যাচার নীরবে সহ্য করা তাদের কাজ নয়,তারাও জন্ম থেকে স্বাধীন স্বকীয়তায় নিজেরাই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অধিষ্ঠাত্রী,”Silent and dignified suffering is not the only badge of female sex”(Women in Modern India : The New Cambridge History of India//Geraldine Forbes.)
এই বাহিনীর জন্মলগ্নে নেতাজী সুভাষচন্দ্র ঘোষণা করেছিলেন যে, মেয়েদের সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে নয়, এই সংগ্রাম সর্বপ্রকার অসাম্য, শোষণ এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে —নারীপুরুষের সমান অধিকার স্বতঃসিদ্ধ,এই সত্য প্রমান করার জন্য। তাই,ঝাঁসী রেজিমেন্টের সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরের উদ্বোধনী ভাষণে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন :” Today while we are facing the gravest hour in our history I have confidence that Indian Womanhood will not fail to rise to the occation.If for the Independence oj Jhansi India produced a Laxmi Baai, Today for the Independece of whole India, India shall produce thousands of Ranis of Jhansi,…(22nd.October/1943,Padeng,kulalampur)
নারীশক্তির প্রতি নেতাজীর এই আস্থা,শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাসের মুল ভিত্তি তৈরী হয়েছিল স্বামী বিবেকানন্দ-এর বানীর অনুপ্রেরনাতে জীবনের প্রথম অবস্থা থেকেই।নারীকে যোগ্য সম্মান দেওয়ার মানসিকতায় নেতাজীর আদর্শের প্রতি অনুরক্ত হয়েই অক্সফোর্ডের বিদুষী,শিক্ষিকা লতিকা ঘোষ-এর দায়িত্বে নেতাজী ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “মহিলা রাষ্ট্রীয় সংঘ”, যা সমকালীন যুগে ছিল অবিশ্বাস্য। তৎকালীন কংগ্রেসের বিরুপতা সত্ত্বেও নেতাজী কলকাতাতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলা স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে সামরিক কায়দাতে কুচকাওয়াজ করে অধিবেশনের উদ্বোধন কঅরিয়েছিলেন।লতিকা ঘোষকে কর্নেল পদাভিসিক্ত করে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীকে পরিচালনা করান। সেদিন কলকাতা দেখেছিল পুরুষদের পাশাপাশি এই বাংলার,এই দেশের প্রায় তিনশ জন মহিলারাও সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ করতে করতে কলকাতার রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছিল। সেই দৃঢ়-প্রত্যয়ী ঘটনার উল্লেখ করে অমৃতবাজার পত্রিকা লিখেছিল…”The Greatest Champion of women’s rights…” (Amritabazar Patrika//22nd.April,1928)
ঝাঁসী বাহিনীর বীরাঙ্গনারা।সেদিন পরেছিলেন শাড়ি ছেড়ে সামরিক পোষাক।প্রত্যেক নারী দেশের স্বাধীনতার লড়াইকে তরাণ্বিত করার জন্য তহবিল গড়ার জন্য নিজেদের অর্থ, গয়না ইত্যাদি দান করেছিলেন গৌরবের সঙ্গে। লক্ষ্মী স্বামীনাথন,জানকি থেবার,পাপাথি থেবার,অঞ্জলী ভৌমিক,সরস্বতী রাজামনি,আয়েষা সুলতানা,অলকা তামাং,পরবীন্দর কাউর,মেরী শেরপা,উলিয়ানা উইলসন,প্রমুখ প্রমুখ। দেশমাতৃকার এই বলিষ্ঠ সন্তানরা সেনা নিবাসে একটা কাঠের তক্তপোষে শুতেন,তাতে ছিল তোষক,বালিশ আর কম্বল। টিনের থালায় খেতেন,টিনের গ্লাসে খেতেন জল। যেমন সামরিক বাহিনীর পুরুষ বিভাগেও হোত বা হয়। আজাদ হিন্দ ফৌজে নারী বাহিনী ছিল নিজের স্বকীয়তায় উজ্জ্বল,উদ্দীপ্ত।নেতাজী যেমন সাম্প্রদায়িকতাকে আজাদ হিন্দ বাহিনীতে ঠাঁই দেননি,ঠিক তেমনই নারী পুরুষের বৈষম্যকেও তিনি বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেননি। এই বিষয়ে প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের “শহীদ” গতি প্রাপ্ত হওয়ার আগে তাঁর শেষ লেখায় তিনি লিখছেন, “I wonderwhy there should be any distinction between males and females for the country’s freedom?…..Why should we, the modern Indian Women, be deprived of joining this noble fight to redeem our country from foreign domination?….(Revolutionary Terrorism in India:-The Roll of Honour// Kalicharan Ghosh,Anecdotes of Indian Martyrs).
দেশের সমস্ত কাজে দেশের নারীদের মনের কথা নেতাজী জানতেন,তিনি বিশ্বাস করতেন স্বামী বিবেকানন্দের সেই মহাবানী “ওরে,যে জাত মেয়েদের সম্মান করে না,তাদের আর কিছু হবেনা।শেষ হয়ে যাবে। নারী হলেন মহাশক্তি,তাঁকে সম্মান কর,সব জায়গাতে আগে রাখ, দেখবি তিনিই রক্ষা করবেন,পথ দেখাবেন”( প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য//স্বামী বিবেকানন্দ)
তাই নেতাজী সুভাষচন্দ্র ৯ই জুলাই,১৯৪৩ সিঙ্গাপুরে এক সুবিশাল জনসমাবেশে দেশের কাজে নিবেদিত পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার জন্য এই নারী বাহিনী তৈরী করা এবং এই নবগঠিত বীর-বীরাঙ্গনাদের সেনানীদলকে নিয়ে তিনি দেশ জননীর পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন, সেই ঘোষণাই তিনি সেদিন করেছিলেন যুদ্ধের ভাষায় ” I want total mobilization and nothing less,for this is a total war, I also want a unit of Brave Indian Women who will wield the sword which the brave Rani of Jhansi wielded in India’s First War of Independence “( Speech at Singapore,9th.July,1943)
তারপর সে এক সুদীর্ঘ ইতিহাসের মহাকাহিনীর মহাভারত।
আজও এই দেশে নারী সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠ হয়নি। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে নেতাজীর স্বপ্ন এবং নিজের তৈরী আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরাঙ্গনা বাহিনী “ঝাঁসী বাহিনী”-ই ছিল প্রকৃত পক্ষে এদেশের মাটিতে নারী স্বাধীনতার জননী।
কিন্তু স্বাধীন ভারতবর্ষ তাদের কথা কি মনে রেখেছে ? যথাযথ স্বীকৃতি দিয়েছে? দিয়েছে কি পূর্ণ মর্যাদা? তবে এটা নিশ্চিত ইতিহাস কখনো কোনদিন দ্বিচারিতা পছন্দ করেনা। তাই এই দেশের জন-সাধারণ অন্তরের অন্তঃস্থলে চিরন্তন প্রণম্যতায় রেখে দিয়েছে সেই ইতিহাসের কথা যার নাম ” ঝাঁসী বাহিনীই নারী স্বাধীনতার জননী”।
আরও পড়ুন
স্বাধীনতা, মা আমার, আমরা তোমার অতন্দ্র প্রহরায় ছিলাম,আছি, থাকবো