Deprecated: Creation of dynamic property Penci_AMP_Post_Template::$ID is deprecated in /home/ndn4dljdt13e/public_html/newsonly24.com/wp-content/plugins/penci-soledad-amp/includes/class-amp-post-template.php on line 46

Deprecated: Creation of dynamic property Penci_AMP_Post_Template::$post is deprecated in /home/ndn4dljdt13e/public_html/newsonly24.com/wp-content/plugins/penci-soledad-amp/includes/class-amp-post-template.php on line 47
শান্তির পথে ৩৭০০ কিমি: বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ‘ওয়াক ফর পিস’, পথসঙ্গী কলকাতার ‘আলোকা’ - NewsOnly24

শান্তির পথে ৩৭০০ কিমি: বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ‘ওয়াক ফর পিস’, পথসঙ্গী কলকাতার ‘আলোকা’

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

“হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব..”, সারা পৃথিবীতে এখন ৫৬টি যুদ্ধ চলছে—দেশে দেশে, একই দেশের অভ্যন্তরে, ধর্ম-জাতপাতের ভিন্নতায়, অন্যদেশের সম্পদ লুণ্ঠনে—ঝরছে মানুষের রক্ত, মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে অসহায় মানুষের জীবন, লুণ্ঠিত হচ্ছে নারীর সম্ভ্রম, ইজ্জত, জ্বলছে ঘরবাড়ি, জ্বলছে ফসলের ক্ষেত, ভস্মীভূত হচ্ছে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। যদিও ইতিহাস-অভিজ্ঞ মানবসভ্যতা জানে যে যুদ্ধের ফলাফল হল শুধুই ক্ষয়ক্ষতি, মৃত্যু, লুণ্ঠন আর প্রতিশোধ এবং পাল্টা প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছুই নয়। তবুও পৃথিবী আজ হিংসার মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। মানুষ মরছে মানুষেরই হাতে। ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে মানবতা। এক অনিবার্য, অনির্বচনীয় অস্থিরতা চারদিকে।

আর এই অস্থির, অসহিষ্ণু, অশান্ত পৃথিবীর বুকে কয়েকজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ভিক্ষু পথের বুকে হেঁটে চলেছেন আড়ম্বরহীন ভাবে এই পৃথিবীর বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনায়, শান্তি-যোদ্ধা হিসাবে—২৪ জন ভিক্ষু সন্ন্যাসীদের এই “Walk for Peace”-এ তাঁদের সঙ্গে পায়ে পায়ে হেঁটে চলেছে আপন ছন্দে আমাদেরই এই প্রিয় নগর কলকাতার পথে থাকা অবহেলিত, উপেক্ষিত, এক অবলা, এক পথ সারমেয়—যার নাম “ALOKA”। পথযাত্রার প্রারম্ভে এই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এসেছিলেন তথাগত বুদ্ধের জন্মভূমি, কর্মভূমি ভারতবর্ষে। তখনই কলকাতার পথে সদ্য পথচলতি গাড়ির চাকায় আহত হয়ে যাওয়া পথ সারমেয়টি তাঁদের নজরে আসে। সন্ন্যাসীরা তার পরিচর্যা করেন এবং সুস্থ করে তোলেন। ভালোবাসা ভালোবাসার বৃত্তেই বাঁধা পড়ে। তাই সেই পথ কুকুরটিও সন্ন্যাসীদের পোষ্য হয়ে যায়; সন্ন্যাসীরাও যেখানে যখন গেছেন, ভালোবেসে কুকুরটিও সেখানে গেছে। অবশেষে নিয়মের সমস্ত কিছু মান্যতা দিয়ে সন্ন্যাসীরা শান্তির জন্য পথে নামেন, সঙ্গে সেই কলকাতার পথ সারমেয়কে সঙ্গী করেই। তার নাম দেন তাঁরা “আলোকা” (Light/Peace Dog)।

এরপর যথানিয়মে শুরু হয় আমেরিকায় টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটন ডিসি অবধি ৩৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করার কর্মসূচি, শান্তির আবেদন নিয়ে। ২০২৫-২৬-এর এই শান্তি পথযাত্রার ভিক্ষুদের পরিচালনায় রয়েছেন ভিয়েতনামী বংশোদ্ভূত বৌদ্ধ ভিক্ষু সন্ন্যাসী “ভিক্ষু পান্নাকারা”। টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের হুং ডাও বিপাসনা ভাবনা সেন্টার থেকে ওয়াশিংটন ডিসি অবধি পথের দূরত্ব হল ৩৭০০ কিলোমিটার। আর সময় লেগেছে ১০৮-১০৯ দিন। এই দলে রয়েছেন ভিক্ষু ভদন্ত, ভিক্ষু সোইমাং-বু, ভিক্ষু পান্নাকারা, ভিক্ষু রৌদামী, রয়েছেন ভিক্ষু ফ্রা আজার্ন মহাদাম ফোম্মাসাম—(যিনি এই পথপরিক্রমায় অংশ নিয়ে পথ চলার সময়ে ডেটন, টেক্সাসে পথচলতি ট্রাকের সঙ্গে দুর্ঘটনায় একটি পায়ের কিছু অংশ কেটে বাদ দিতে হয়। এরপর কিছুদিন হাসপাতালে থাকার পর তিনি সকল যন্ত্রণা, হতাশা ভুলে আবার শান্তিযাত্রার জন্য পথপরিক্রমায় যোগ দিয়েছিলেন)। এবং অন্যান্য ভিক্ষু সন্ন্যাসী আর সেই কলকাতার পথ সারমেয় “আলোকা”—সবার প্রিয় “Peace Dog”, শান্তির সারমেয়।

সমস্ত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে করতে তাঁরা হেঁটে চলেছেন—শান্তির জন্য—সহাস্যমুখে, মাইলের পর মাইল পথ। সারা বিশ্বের সামাজিক মাধ্যমে সেই ছবি দেখেছেন, দেখছেন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ। চলার পথে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন স্থানে। বৌদ্ধ ভিক্ষু সন্ন্যাসীরা আন্তরিক ভাবে অভিনন্দন ও আশীর্বাদ বিলিয়েছেন হাসিমুখে সকল মানুষ আর সকল অবলা প্রাণীদের প্রতি করুণাঘন ভালোবাসায়।

সেই তাঁরাই এক সময়ে এই শান্তির পথযাত্রা শেষে লক্ষ্যে পৌঁছে বিশ্বকে প্রণাম জানাতে গিয়ে পবিত্র কান্নায় সুস্নাত হয়েছেন। সেই দৃশ্যও দেখেছে সারা বিশ্বের মানুষ। আর আমরা জানলাম, দেখলাম—সন্ন্যাসী ভিক্ষু মহাযোদ্ধারাও কাঁদেন। আর তাঁরা যখন সবার সামনে কাঁদেন, তখন সারা পৃথিবীও কাঁদে, সারা প্রকৃতিও ক্রন্দসী হয়ে ওঠে। তাঁরা কাঁদেননি কোনও দুর্ঘটনায় আহত হয়েও; কান্না ঝরেনি চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েও। শান্ত, স্থির হয়ে গায়ে মেখে নিয়েছেন ভয়ংকর শৈত্যপ্রবাহ। সুদীর্ঘ পথচলার ক্লান্তিতে, অভুক্ততার শ্রান্তিতেও কান্না আসেনি তাঁদের চোখে। কোনও প্রতিকূলতাতেই তাঁরা শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েননি। অসংখ্য মানুষের প্রার্থনায়, প্রশংসায়, আবেগের আতিশয্যে তাঁরা ছিলেন ভাবলেশহীন, অচঞ্চল, অটল, নিঃশব্দ।

সারাবিশ্ব দেখেছে শান্তির যোদ্ধারা কত শক্তিশালী। শান্তির শিকড় সভ্যতার মাটির প্রত্যন্ত গভীরে নিমগ্ন—মানুষের অন্তরের অন্দরমহলের নিবিড়তায়, মননে, চিন্তনে, সৃজনে, অনুভবে—নীরবে, গৌরবে। সেখানে নেই তিক্ততা, অহমিকা, দ্বিচারিতা, পক্ষপাতিত্ব—সেখানে আছে শুধুই সেবা, ভালোবাসা এবং পরম শান্তি।

সেই যোদ্ধারা যখন ওয়াশিংটন ডিসির কোটি মানুষের সমবেত সমাবেশে মানুষের এই পৃথিবীর পদপ্রান্তে নিবেদন করলেন তাঁদের প্রণতি—তখন নীরব অশ্রুধারা বয়ে চলেছে সন্ন্যাসীদের চোখে। ইতিহাস মুগ্ধতার অশ্রুভরা নয়নে সাক্ষী হয়ে রইল উপস্থিত কোটি মানুষের অন্তরের অনুভূতিতে, সামাজিক মাধ্যমে সেই মুহূর্তের ছবিতে। শান্তির প্রার্থনা উচ্চারিত হল সার্বজনীনতায়।

এই অশ্রু কোনও দুর্বলতা নয়—এই অশ্রু স্মৃতির এবং সত্তার; এই অশ্রু শান্তিপথের এবং শান্তিশপথের। অন্তরে অন্তরে কৃতজ্ঞতার ঢেউয়ে সমস্ত অপমূঢ়তার, অপভাবনার, অপসংস্কৃতির দেওয়াল ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসে এক অনন্য উদারতা। সেই অশ্রুর প্রতিটি বিন্দুতে থাকে বিস্ময়, থাকে ভালোবাসা, থাকে শ্রদ্ধা, থাকে ভক্তি। থাকে অসহায়তায় আশ্রয়ের খোঁজ—থাকে শান্তির প্রার্থনা—থাকে ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা।

একজন যোদ্ধার সবচেয়ে সাহসী কাজ হল বিনম্রতায় নত হওয়া পৃথিবীর পদপ্রান্তে। এঁরা তাই করেছেন, নিজেদের উজাড় করে শূন্য করে দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতায় হৃদয়ের কপাট উন্মুক্ত করে দিয়েছেন—”আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া,/ বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।”

পৃথিবী বদলায় বড় বড় ভাষণে নয়—পৃথিবী বদলায় নীরব, অশ্রুসিক্ত, বিনম্র মুহূর্তের বন্দিত প্রার্থনায়। তাই শান্তি আর ভালোবাসার জন্য যোদ্ধারাও কাঁদেন। আর তাঁরা যখন কাঁদেন, তখন পৃথিবী আরও বেশি পবিত্র হয়ে ওঠে। মনের যাবতীয় কলুষতার বুকে জন্ম নেয় শান্তির শতদল। সমস্ত পৃথিবী ভালোবাসার কাজল চোখে পরে তখন তাকিয়ে দেখে এক নতুন সূর্যকে—যার নাম বিবস্বান। শান্তির প্রার্থনায় সুস্নাত হয়ে ওঠে পৃথিবী শতদল বিবস্বানের নৈসর্গিকতায়, উদারতায়, ভালোবাসায়।

Related posts

মহা শিবরাত্রি: প্রাচীন ইতিহাস, শিব-পার্বতীর বিবাহ ও বিশ্বজুড়ে শিব উপাসনার ধারাবাহিকতা

পুঁথি থেকে ই-বুক: বইয়ের বিবর্তন, ধ্বংসের ইতিহাস আর কলকাতা বইমেলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

‘আমার সোনার বাংলা’: গান, ইতিহাস ও মানবতার রাজনীতি