দার্জিলিং চায়ের জিআই (Geographical Indication) তকমা রক্ষা এবং নিম্নমানের বিদেশি চা রুখতে কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস মিলেছে বিজেপির নির্বাচনী সংকল্পপত্রে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাতে প্রকাশিত এই ইস্তেহারে উত্তরবঙ্গের চা শিল্প উন্নয়ন ও শ্রমিকদের জীবনমান বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে।
তবে এই প্রতিশ্রুতিতে নতুনত্ব দেখছেন না চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মহলের একাংশ। তাঁদের দাবি, বহু বছর ধরেই এই দাবিগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানানো হলেও বাস্তবে কোনও বড় পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে দার্জিলিং চা শিল্প আজ গভীর সংকটে।
দার্জিলিং পাহাড়ে বর্তমানে জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত ৮৭টি চা বাগান রয়েছে। তার মধ্যে অন্তত ১৫টি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাকি বাগানগুলিতেও অধিকাংশ গাছ এক-দেড়শো বছরের পুরনো হওয়ায় উৎপাদন ক্রমশ কমছে। অথচ লোকসানের চাপে নতুন করে চা গাছ লাগানোর মতো পরিস্থিতিও নেই মালিকদের।
চা বাগান মালিকদের একাংশ ইতিমধ্যেই বাগান বিক্রির চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পের এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদেরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনও বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে। গত দুই দশকে দার্জিলিংয়ে বৃষ্টিপাত প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি। এর ফলে ‘সিলভার নিডল হোয়াইট টি’-র মতো উচ্চমানের চায়ের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭০ সালে দার্জিলিং চায়ের উৎপাদন ছিল প্রায় ১৪ মিলিয়ন কেজি, যা ২০২৪ সালে নেমে এসেছে মাত্র ৫.৫১ মিলিয়ন কেজিতে। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও কমে গিয়েছে উৎপাদন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি নিম্নমানের চায়ের প্রতিযোগিতা। নেপাল ও কেনিয়া থেকে আসা সস্তা চা অনেক সময় দার্জিলিং চায়ের নামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দার্জিলিং চায়ের ব্র্যান্ড ভ্যালু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চা বণিকদের বক্তব্য, ফার্স্ট ফ্লাশ মরশুম—যা দার্জিলিং চায়ের সবচেয়ে মূল্যবান সময়—সেটিও এখন বৃষ্টির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মতো আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানির পরিমাণ কমছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জিআই রক্ষা নয়—চা শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। পুরনো বাগান সংস্কার, নতুন চারা রোপণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ড সুরক্ষা—সব দিকেই সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হলে, দার্জিলিং চায়ের ঐতিহ্য ও অর্থনীতি—দুটিই বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন শিল্প মহলের একাংশ।