নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা:
রাজ্য সরকারের খাদ্য সুরক্ষা বিধি না মানার অভিযোগে কলকাতা পুরসভার ‘লাইসেন্স বাতিল’-এর নোটিস পাওয়া ৪০টি নামী রেস্তরাঁ ও মিষ্টির দোকান ঘিরে বুধবার দিনভর চরম উৎকণ্ঠা ও বিতর্ক ছড়াল খাদ্যরসিকদের মধ্যে। এরই মধ্যে রাতে আরও ২৫টি রেস্তরাঁর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সব মিলিয়ে কলকাতায় সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬৫-তে। কলকাতার পাশাপাশি জেলাগুলিতেও একাধিক রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানকে নোটিস পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
তবে পুরসভার প্রকাশিত তালিকা এবং পুরকমিশনার স্মিতা পাণ্ডের সাংবাদিক বৈঠকে উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানের নাম নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, পুরকমিশনার যে সমস্ত রেস্তরাঁর নাম উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে নিজাম, বিগ বস-এর মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম সরকারি তালিকায় নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রেস্তরাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা পুরসভার কাছ থেকে কোনও সাসপেনশন বা লাইসেন্স বাতিলের নোটিস পায়নি।
এদিকে, বেশ কিছু রেস্তরাঁর দাবি, খাদ্য সুরক্ষা আইন ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে পুরসভার এই ধরনের পদক্ষেপের আইনগত ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ৪০টি রেস্তরাঁ ও মিষ্টির দোকানের বিরুদ্ধে পুরসভার পদক্ষেপ ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে আরও একটি প্রশ্ন—হলদিরাম, যুগলস, জয়হিন্দ ও গুপ্তা ব্রাদার্সের মতো জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে কেন খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকরা পরীক্ষা করতে গেলেন না? যদিও এই প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কেন, তার নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
‘তালিকায় যে দোকানের নাম, সেটি আমাদের নয়’
ভবানীপুরের প্রখ্যাত মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠান Balaram Mullick & Radharaman Mullick Sweets-এর কর্ণধার সুদীপ মল্লিক পুরসভার তালিকা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, পুরসভার তালিকায় যে মিষ্টির দোকানের নাম রয়েছে, সেটি তাঁদের প্রতিষ্ঠান নয়।
সুদীপ মল্লিক বলেন, “পুরসভার তালিকায় যে মিষ্টির দোকানের উল্লেখ রয়েছে, সেটি আমাদের নয়। আমাদের কোনও সংস্থার ক্ষেত্রে এমন কোনও নোটিসও আসেনি। আর আমরা মিষ্টি তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক খাদ্যবিধি মেনে চলি।”
নোটিস পাওয়ার দাবি নস্যাৎ আরসালানের
অন্যদিকে, প্রসিদ্ধ বিরিয়ানি প্রস্তুতকারক Arsalan Restaurant & Caterer-এর পক্ষ থেকেও বুধবার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানানো হয়, খাদ্যের গুণমান নিয়ে কোনও আপস করা হয় না। সংস্থার সিওও হামজা আহসান দাবি করেন, তাঁদের কোনও শাখার ক্ষেত্রেই লাইসেন্স বাতিল বা সাসপেনশনের নোটিস আসেনি।
মুজাফফর আহমেদ স্ট্রিটের শাখায় বর্তমানে সংস্কারের কাজ চলছে বলেও জানানো হয়।
আরসালানের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, কোনও ধরনের ভেজাল বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয় না। বাসি বা পচা মাংসও পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের বক্তব্য। মটন বিরিয়ানির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর থেকে উপকরণ আনা হয় এবং চিকেনের ক্ষেত্রে ব্রয়লার নয়, দেশি মুরগি ব্যবহার করা হয় বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।
ভবিষ্যতে নিজেদের রাসায়নিক ও মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরি চালু করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে আরসালান।
সংস্থার তরফে অমিতাভ ঘোষ বলেন, “কোনও খাবার শেষ হয়ে গেলে ‘সোল্ড আউট’ লিখে দিই, যাতে খাবার নিয়ে কোনও সংশয় না হয়।” যশোর রোডের শাখায় খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকরা গিয়ে খাবার পরীক্ষা করেছেন বলেও জানান তিনি। তাঁদের দাবি, পরীক্ষার সময় ‘ট্যাঙ্গি টেস্ট’-এর বিষয়টিও দেখা হয়েছিল।
তবে রাজ্য সরকারের খাদ্য সুরক্ষা অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে আরসালান কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, খাদ্যের গুণমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন।
তালিকায় একাধিক পরিচিত নাম
পুরসভার লাইসেন্স বাতিলের তালিকায় রয়েছে দাদা বউদির হোটেল, ডেন জং কিচেন, পার্ক স্ট্রিটের ডন জিওভানি-সহ একাধিক পরিচিত রেস্তরাঁ।
তবে তালিকায় থাকা এবং পুরকমিশনারের বক্তব্যে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, কোন ধারায় নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং সাময়িক লাইসেন্স বাতিলের আইনি প্রক্রিয়া কী—তা নিয়েই এখন জোরদার হচ্ছে বিতর্ক।
একদিকে প্রশাসনের দাবি, খাদ্য সুরক্ষার সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না। অন্যদিকে রেস্তরাঁ মালিকদের একাংশের বক্তব্য, ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং আইনি প্রক্রিয়া স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ফলে কলকাতার জনপ্রিয় খাবারের দোকান ও রেস্তরাঁগুলিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা বনাম প্রশাসনিক পদক্ষেপের নতুন বিতর্ক।