পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক প্লেটোর অপছন্দের জিনিস ছিল গণতন্ত্র। কারণ তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব যে জলের মতো তরল এবং লঘু, সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছিলেন তিনি— “The Ship of State”।
কী সেটা? সেটা হলো, একটি জাহাজ মাঝ সমুদ্রে মারাত্মক ভয়াবহ বিপদে পড়েছে। প্রচণ্ডরকম ঝড়ের দাপট, সামনে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ, চারদিকে ডুবোপাহাড়। সেই মুহূর্তে জাহাজের নাবিকেরা নিজেদের মধ্যে তর্কে মত্ত। প্রত্যেকেই জাহাজের হাল ধরতে চায়, কিন্তু জাহাজ চালানো বা তাকে সঠিক দিকনির্দেশে পরিচালনা করার সম্পর্কে কোনও ধারণাই বিশেষ নেই তাদের। তারা তখন ভোটের ব্যবস্থা করল। যথারীতি ভোট হলো।
কিন্তু শেষে কী হলো? যারা গলাবাজি করতে পারছিল, আর বাকিদের মিষ্টি মিষ্টি নানা প্রতিশ্রুতিতে তুষ্ট করছিল, তাদের খুব সক্রিয় দেখা গেল। আর যে বা যারা আকাশের নক্ষত্র দেখে, আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি দেখে সব বুঝতে পারত, চিনতে পারত, যাদের সেই বিষয়ে অভিজ্ঞতা ছিল—তাদের অবহেলা করে, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে, বিদ্রুপ করে সরিয়ে রাখা হলো। তারা শিকার হলো পরিস্থিতির। অবশেষে ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো—গলাবাজিদের গণতন্ত্র জয়ী করল, কিন্তু জাহাজ ডুবতে শুরু করল।
প্লেটোর মতে এটাই গণতন্ত্রের আসল চেহারা। এখানে প্রজ্ঞার চেয়ে হম্বিতম্বি করে জনপ্রিয়তার গুরুত্ব বেশি। কারণ মনে রাখা দরকার যে, ইতিহাসে তৎকালীন মানুষের গণতান্ত্রিক মতামতেই যিশুখ্রিষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, গ্যালিলিওকে কারাবন্দী করা হয়েছিল, সক্রেটিসকে বিষপান করিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সাহসী নারী জোয়ান অব আর্ক এবং জিওদার্নো ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এই রকম বহু ইতিহাস আছে এই সভ্যতায়। প্লেটোর মতে সত্য হেরে যায় কেবল গাণিতিক সংখ্যার কাছে। আসলে গণতন্ত্র মানুষের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও বিচারক্ষমতার চর্চায় থাকা উচিত; নেহাত হুজুগে নয়। হুজুগ হলে তা রাষ্ট্রের পক্ষে ক্ষতিকারক। হুজুগ অপরিণামদর্শিতার আরেক অবস্থা।
প্লেটো ভয় পেতেন স্বৈরাচারী অজ্ঞতার হাতে ক্ষমতায়নকে। কারণ ভোটের মাধ্যমে যখন সত্য নির্ধারণ করা হয়, হাততালির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা বাছাই করা হয়, তখন রাষ্ট্র যোগ্যতাকে খোঁজার চেয়ে বিচার-বিশ্লেষণকে বাদ দিয়ে ভিড়ের তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে। তাই প্লেটো সাবধান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন— শুরুতে আসে নীতিহীন স্বাধীনতা। তারপর দক্ষতার জায়গা দখল করে নেয় মানুষের চিন্তাভাবনাহীন হুজুগে মতামত। এরপর আসে চাটুকার রাজনীতিবিদদের উত্থান, যারা অবাস্তব স্বপ্ন দেখায়। স্বভাবতই সমাজে ও রাষ্ট্রে এক চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। রাষ্ট্রব্যবস্থায় অসহিষ্ণুতার জন্ম হয়। তখন মানুষ শান্তি ও স্বস্তির জন্য দিশেহারা হয়ে পড়ে। আর ঠিক তখনই জনমতের মুখোশ পরে হাজির হয় ভদ্রবেশী স্বৈরতন্ত্র।
প্লেটো কিন্তু গণবিরোধী ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিভ্রম-বিরোধী। তাঁর মতে রাষ্ট্র চালানো উচিত তাদেরই, যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা আছে।
আজ প্লেটোর জন্মের আড়াই হাজার বছর পরেও সমুদ্রে আগের মতোই উত্তাল ঝড়ঝঞ্ঝা। কেবল আমাদের বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা নামক জাহাজটি আরও বিপন্ন হয়ে পড়ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। তাই সারা বিশ্বের বুকে অসহিষ্ণুতা, পরদেশ আক্রমণ এবং ধ্বংসের ছড়াছড়ি।
মানুষকে বাঁচাতেই হবে, সভ্যতাকে সঠিক পথ দেখাতেই হবে। নইলে আগামীতে আমাদের সভ্যতার স্থায়িত্ব বজায় থাকবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।