সংশোধিত ওয়াকফ আইনের বিরোধিতায় চলা বিক্ষোভের আবহে মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জে বাবা-ছেলে খুনের ঘটনায় কড়া শাস্তির নির্দেশ দিল আদালত। হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর পুত্র চন্দন দাসকে কুপিয়ে খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ১৩ জন অভিযুক্তকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল জঙ্গিপুর মহকুমা আদালত। মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে সাজা ঘোষণা করেন বিচারক অমিতাভ মুখোপাধ্যায়।
কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক দোষীকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
গত ১২ এপ্রিল, শনিবার সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদ ঘিরে অশান্ত হয়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদের একাধিক এলাকা। জঙ্গিপুরের শমসেরগঞ্জ, সুতি ও ধুলিয়ান অঞ্চলে ছড়ায় হিংসা। সেই অশান্তির মধ্যেই শমসেরগঞ্জে প্রাণ হারান স্থানীয় বাসিন্দা হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন দাস। অভিযোগ ওঠে, তাঁদের ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে এনে কুপিয়ে খুন করা হয়। এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক শোরগোল পড়ে যায়।
তবে প্রথম থেকেই রাজ্য পুলিশ দাবি করে আসছিল, এই খুন রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত শত্রুতার ফল। সেই দাবিই চার্জশিটে তুলে ধরা হয়। মামলার শুনানি শেষে সোমবার আদালত জানায়, ব্যক্তিগত রোষ থেকেই এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনার তদন্তে জেলা পুলিশের তরফে ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকের নেতৃত্বে একটি সিট (Special Investigation Team) গঠন করা হয়। একে একে ১৩ জন অভিযুক্তকেই গ্রেফতার করে পুলিশ। সরকারি আইনজীবী জানান, ঘটনার ৫৫–৫৬ দিনের মধ্যেই চার্জশিট পেশ করা হয়েছিল এবং দ্রুত বিচার চেয়ে আবেদন জানানো হয়।
সাজা ঘোষণার দিন সকাল থেকেই শমসেরগঞ্জ এলাকা ছিল থমথমে। সম্ভাব্য অশান্তির আশঙ্কায় এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের রুটমার্চ চলে। গোটা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখে প্রশাসন। সাজা ঘোষণার পর আদালত চত্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন দোষীরা। তাঁদের দাবি, তাঁদের ফাঁসানো হয়েছে।
এ দিন সাজা ঘোষণার আগে কলকাতার ভবানী ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করেন রাজ্য পুলিশের এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) সুপ্রতিম সরকার। তিনি জানান, তদন্তে শুধু রাজ্য নয়, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডেও তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছিল। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ, অভিযুক্তদের মোবাইল টাওয়ার লোকেশন, এমনকি তাঁদের হাঁটাচলার ধরন (GAIT test) পরীক্ষা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে সেই তথ্য পুরোপুরি মিলে যায়।
সুপ্রতিম সরকার আরও জানান, উদ্ধার হওয়া খুনের অস্ত্রে রক্তের দাগ পাওয়া যায় এবং সেই রক্তের ডিএনএ নিহত হরগোবিন্দ ও চন্দন দাসের ডিএনএ-র সঙ্গে মিলে যায়। চার্জশিটে গণপিটুনি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়—যার মধ্যে রয়েছে ডাকাতি, অন্যের বাড়িতে ঢুকে আক্রমণ, মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে সহিংসতা, জোর করে আটকে রাখা এবং খুনের উদ্দেশ্যে বাড়িতে প্রবেশের মতো গুরুতর অভিযোগ।
এই রায়ের পর শমসেরগঞ্জের ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বে পৌঁছাল বলেই মনে করছে প্রশাসনিক ও আইনি মহল।