পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার খসড়া তালিকা প্রকাশের পর এ বার শুরু হয়েছে শুনানির জন্য ভোটারদের নোটিস পাঠানোর কাজ। এই আবহেই সোমবার কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তৃণমূল কংগ্রেসের বুথ স্তরের এজেন্টদের (বিএলএ) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সভা থেকেই নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে একের পর এক তীব্র অভিযোগ তোলেন তিনি।
তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতার ১১টি বিধানসভা কেন্দ্রের বিএলএ-দের পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া ও হুগলির বাছাই করা কয়েকটি বিধানসভা এলাকার বিএলএ ও বিএলএ-২-দের এই সভায় ডাকা হয়েছিল।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বলেন,
“আরও দেড় কোটি নাম বাদ দিতে হবে—এটা নাকি বিজেপির খোকাবাবুদের আবদার। হাত ঘোরালে নাড়ু পাব। নাড়ু নিয়ে ভোটে জিতব, নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগাব। বাংলাকে দখল করব, বাংলাকে অপমান করব, বাংলার ইতিহাস ভুলিয়ে দেব—নানান রকম চালাকি চলছে। কিন্তু চালাকির দ্বারা মহৎ কাজ হয় না।”
বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে একযোগে আক্রমণ করে তিনি বলেন,“কলকাতা জেলা আগে অন্য রকম ছিল। আগে ১০০টি ওয়ার্ড ছিল, এখন ১৪৪টি। ২০০৯ সালে ডিলিমিটেশন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কি একবারও ভেবেছে? বিজেপির দালালরা কি ভেবেছে? বিএলও-দের গালাগালি দেওয়ার আগে কি ঠিক করে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল? সবটাই অপরিকল্পিত। বিজেপির কথায় বিজেপি কমিশন চলছে।”
ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,“২০০২ সালের পরে ডিলিমিটেশন হয়েছে। এক ভোটার এক নির্বাচনী ক্ষেত্র থেকে অন্যত্র চলে গিয়েছে। আগে ভবানীপুর ছিল আলিপুরে, এখন ভবানীপুর আলাদা। সব বিধানসভায় তাই হয়েছে। কিন্তু কমিশনের ম্যাপিংটাই ভুল। এটা গ্রেট ব্লান্ডার।”
নাম ও ঠিকানা সংক্রান্ত গরমিল নিয়েও কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। মমতার কথায়,“২০০২ সালে একজন যে ঠিকানায় ছিলেন, আজ তিনি সেখানে নেই—এটাই স্বাভাবিক। বিয়ের পরে মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি যায়। কেউ পদবি বদলায়, কেউ বদলায় না। বাংলা আর ইংরেজি বানানে সামান্য ফারাক থাকলেই নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে। গরিব মানুষ ইংরেজি বানান বুঝবে কী করে?”
একটি আবেগঘন মন্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,“এইসব কারণে মানুষ আত্মহত্যা করছে। এর দায় কার? নির্বাচন কমিশন। বিএলও-দের দোষ নেই। কমিশন ৪৬ জনের প্রাণ নিয়েছে—এর দায়িত্ব নিতে হবে।”
সভায় মমতা আরও বলেন,“স্কুলে কতজন পড়ত! কতজনের বাবা-মা, ঠাকুরদার জন্মের সার্টিফিকেট আছে? আমার মায়ের জন্মকার্ড চাইলে আমি দিতে পারব না। মোদী-শাহ পারবেন? ওরা পারে না এমন কোনও কাজ নেই—ডুপ্লিকেট বানাতে এক সেকেন্ড লাগে। আমরা ডুপ্লিকেট বানাব না। বড়দিন আসছে, আমরা কেক বানাব। সেই কেক খেয়ে বিজেপিকে হজম করব।”
ডিলিমিটেশন, বিয়ে, বানান ভুল—এই সব কারণে নাম বাতিলের অধিকার কে দিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মমতা। তিনি জানান, এলাকায় এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিটিং-মিছিল হবে এবং বিএলএ-১ ও বিএলএ-২-দের কোনওভাবেই হেনস্থা করা যাবে না।
দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,“এ বার পিকনিক-টিকনিক বন্ধ। পিকনিক হবে ২০২৬ সালে জেতার পরে।”
সভা চলাকালীন হঠাৎই নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে মাইক বিভ্রাট ঘটে। বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য। এ নিয়ে অন্তর্ঘাতের অভিযোগ তুলে মমতা বলেন,“সর্বত্র সমন্বয়ের অভাব। ২২–২৪ বার কমিশন নিয়ম বদলেছে। অ্যাপ বদলেছে। সবটাই বিজেপিকে জেতানোর জন্য। কয়েকজন বিজেপির বন্ডেড লেবার কাজ করছে। তোমরা বন্ডেড লেবার নও, তোমরা বন্ডেড ক্রীতদাস।”
এপিক নম্বর ও অ্যাপ সংক্রান্ত সমস্যার কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি,“২০০২ সালের তথ্য ধরে নাম খোঁজার কোনও অ্যাপ নেই। বহু বৈধ ভোটার হয়রান হচ্ছেন। ২০০২ সালের এপিক নম্বর আর বর্তমান নম্বরের কোনও মিল নেই। এটা কি ক্রিমিনাল অফেন্স নয়? এটা বেআইনি, অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক।”
সবশেষে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের বাসিন্দাদের প্রসঙ্গ তুলে মমতা বলেন,“আপনি যদি এখানে থাকেন, কাজ করেন, পরিবার থাকে—তাহলে আপনার সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার অধিকার নির্বাচন কমিশনের নেই। বাংলায় থাকতে চাইলে এখানেই ভোটার তালিকায় নাম তুলুন।”
সভা শেষে তৃণমূল নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দেয়, এসআইআর প্রক্রিয়ায় একটি বৈধ নামও যদি বাদ যায়, তার বিরুদ্ধে দল রাজনৈতিক ও আইনি—দু’ভাবেই লড়াই চালিয়ে যাবে।