প্রথম পাতা প্রবন্ধ গুড ফ্রাইডে থেকে ইস্টার সানডে: মানবতার পুনরুত্থান ও পবিত্রতার বার্তা

গুড ফ্রাইডে থেকে ইস্টার সানডে: মানবতার পুনরুত্থান ও পবিত্রতার বার্তা

20 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবীর মানব সভ্যতায় পালনীয় অতি প্রাচীন অন্যতম পবিত্র উৎসবের নাম

“গুড ফ্রাইডে”, “ইস্টার স্যাটার ডে”, এবং “ইস্টার সান ডে”। বাইবেল এবং ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী মানবতার যিশুখ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন যেদিনটিতে, সেই দিনটি গুড ফ্রাই ডে হিসাবে সারা বিশ্বে পালিত হয়। এই দিনের পরেই যে রবিবার, সেই রবিবারকে বলা হয় ইস্টার সান ডে। কারণ, ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরে এই ইস্টার সান ডে, মানে তিন দিনের মাথায় যে রবিবার, সেই রবিবারের দিনে যীশুখ্রীস্ট তাঁর প্রিয়জনদের দেখা দিয়েছিলেন। তারপর তিনি পরমাত্মার সাথে লীন হয়ে যান, বাইবেলের বিশ্বাস অনুসারে।

যিশুখ্রিস্টর ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল কোন বছরে, সেই বিষয়ে আধুনিক যুগের বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি, অবস্থান মেপে নির্ণয় করে বলেছিলেন যে, সেটা ছিল যীশুর জন্মের পরে ৩৪ তম বছর।

যীশু মানুষকে এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। তিনি সকল জীব ও প্রাণী এবং উদ্ভিদের প্রতি সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার মানসিকতার জন্ম দেওয়ার জন্য মানব সভ্যতাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কারণ এই বিশ্বের যা কিছু, সবই সেই ঈশ্বরের সৃষ্টি—সকলেই তাই সেই ঈশ্বরেরই সন্তান। কিন্তু এই কথা সেই সময়ের শাসকের মনঃপুত না হওয়ায়, যীশুকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়, এবং যীশুরই ১২ জন অনুগামীদের মধ্যে একজন অনুগামী, যার নাম জুডাস, তার বিশ্বাসঘাতকতায় যীশুকে বন্দী করে ক্রুশবিদ্ধকরণ করা হয়েছিল। আর এই ক্রুশবিদ্ধকরণের আদেশ দিয়েছিল সেখানকার শাসক রোমান রাজ্যপাল পন্টিয়াস পিলাতের বিচারসভা।

পরের দিন শনিবার সন্ধ্যেবেলা প্রায় মৃত যীশুর দেহখানি যীশুর অপরাপর অনুগামীরা কাছের এক পাহাড়ি গুহায় নিয়ে গিয়ে রেখেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পিটার, জন, মরিয়ম, পল প্রমুখরা। পরের দিন রবিবার শাসকের ভয়ে সকলে ভোরবেলা সেই গুহায় এসে দেখেন, আগের দিন গুহার মধ্যে একটি পাথরের বেদীতে তাঁদের রেখে যাওয়া শায়িত যিশুখ্রিস্ট নেই। অনুগামীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। বেশ কিছুক্ষণ পরে সেই গুহার ভিতরে এক জ্যোতির্ময় আলোকপুরুষ উপস্থিত হন। সকলেই তাঁকে দেখে চিনতে পারেন—এই তো তাঁদের প্রিয় ঈশ্বরের পুত্র যীশু। তখন যীশু তাঁদের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন—যাকে বাইবেলে “রেজারেকশন” বা পুনরুত্থান বলা হয়।

শান্তির বাণী, সাম্যের বাণী, সম্প্রীতির বাণী প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পবিত্র গুড ফ্রাইডে থেকে পবিত্র ইস্টার সানডে পালিত হয়।

জার্মান শব্দ “ওস্টার” শব্দ থেকে, এবং ল্যাটিন “এস্টার” শব্দ থেকে ইংরেজি “ইস্টার” শব্দের আবির্ভাব, যার অর্থ হল “ঊষা” বা “প্রত্যুষ”। বাইবেলের মতে যিশুখ্রিস্টের এই পুনরুত্থান হল মানবজাতির জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা। অর্থাৎ এক নতুন ভোরের আবির্ভাব, এক নতুন প্রত্যুষের আগমনী বার্তা।

এই ইস্টার সান ডে সারা বিশ্বে প্রার্থনা করা হয় নিজেদের পবিত্রতায় পরিপূর্ণ করার আবেদনে। এই প্রার্থনাকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন প্রাচীনকালে ল্যাটিন এবং গ্রীক ভাষায় বলা হত—”পাসকা”, “পাসখা”, বা “পাসচা”। ফরাসী ভাষায় বলা হত “পাকস্” (Paques)। স্পেনীয় ভাষায় “পাস্কুয়া” (Pascua)। ইংরেজিতে “পাস ওভার” বলা হয়।

তবে, যে দেশে যে নামেই এই প্রার্থনা উচ্চারিত হোক না কেন, তার আসল অন্তর্নিহিত অর্থ হল “পার হয়ে যাওয়া”। অর্থাৎ ঈশ্বরের সন্তান যীশুর পুনরুত্থানের কারণে, তাঁকে স্মরণ করে যুগে যুগে বিশ্বের মানবজাতি যেন তাঁদের অজ্ঞানতাবশত কৃত অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতার দিকে উত্তরণ ঘটাতে পারে।

তাই, আজ দু’হাজার বছর ধরে সারা বিশ্বে সকল দেশে এই গুড ফ্রাইডে, ইস্টার সানডে যথাযথ সমাদরে পালিত হয়। আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, কেশবচন্দ্র সেন, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রমুখরা, এবং উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ব্রাহ্ম সমাজের সকলেই এই দিনগুলি শ্রদ্ধার সাথে পালন করতেন। আমাদের দেশের বিভিন্ন গীর্জায় এই পবিত্র দিন পালন করা হয়। সকল ধর্মের, সকল জাতের, সকল বয়সের মানুষ সেই উৎসবে অংশ নেন। এই দিনটি প্রতিটি মানুষের নিজেকে আরও সহনশীল, সংবেদনশীল, সহিষ্ণু হওয়ার প্রার্থনায় আত্মনিবেদনের এক পবিত্র দিন।

প্রুফচেক করা লেখা (হুবহু রেখে সংশোধিত)

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.