পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
এই বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে চলছে রবীন্দ্রনাথের জন্মতিথি উপলক্ষে কবিপক্ষ।
এই কবিপক্ষে আমরা যদি এক অন্য অনন্য রবীন্দ্রনাথের খোঁজ করি, তাহলে কি খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে? মনে হয় তা হবে না।
রবীন্দ্রনাথ এবং নরেন্দ্রনাথ (স্বামী বিবেকানন্দ) প্রায় একই অঞ্চলের সমসাময়িক দুই ব্যক্তিত্ব। আর সেই সময়কালে এই বাংলায় তথা ভারতবর্ষে বিরাজ করছেন স্বয়ং মহাবিশ্বের মহাবতার-পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। খুব স্বাভাবিকভাবেই মন আগ্রহী হয়ে ওঠে জানতে, সেই সময়ে এই তিন স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তি কি কখনও কোথাও মুখোমুখি হয়েছিলেন?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হ্যাঁ, এই ত্রয়ীর সাক্ষাৎ হয়েছিল, হয়েছিল একাধিকবার। তাঁদের মধ্যে ছিল এক মৌনমুখর পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
১৮৮২ সাল। ব্রাহ্ম সমাজের প্রচারক এবং সম্মানীয় মানুষ মহাত্মা রাজনারায়ণ বসুর কনিষ্ঠা কন্যা লীলাবতী দেবীর (শ্রী অরবিন্দের ছোট মাসিমা) বিয়ে হবে। পাত্রের নাম বিখ্যাত ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র।
সেই উপলক্ষে বিয়ের অনুষ্ঠানে গান গাইবার প্রস্তাব দিলেন রাজনারায়ণ বসুর বিশেষ সুহৃদ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পুত্র ২১ বছরের যুবক রবীন্দ্রনাথকে। তাঁর সঙ্গে সঙ্গী হতে সবিশেষ আমন্ত্রণ জানালেন পাশের পাড়ার আর এক প্রতিভাবান যুবক এবং দেবেন্দ্রনাথের অতি স্নেহের পাত্র নরেন্দ্রনাথ দত্তকে। নরেন্দ্রনাথ তখন ১৯-এর সদ্য যুবক।
রবি ঠাকুর ছয়টি গান তৈরি করলেন— “দুই হৃদয়ের নদী..”, “শুভ দিনে এসেছো দোঁহে..” ইত্যাদি। গানের মহলা শুরু হল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। শোনা যায়, অনুষ্ঠানের দিনে সেই গান সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয়েছিল। পিয়ানোতে ছিলেন রবি ঠাকুর, সঙ্গতে ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দ)। এবং সমবেত কণ্ঠে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ, চুণীলাল মুখোপাধ্যায় (জন্মান্ধ ছিলেন এই গুণী মানুষটি), কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং সুন্দরীমোহন দাস।
এই খবর পরে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই খবরের এক জায়গায় স্বয়ং লীলাবতী দেবী জানিয়েছিলেন— “নরেনবাবু সেদিন খুব সুন্দর দরাজ কণ্ঠে গেয়েছিলেন। রবি বাবুসহ উপস্থিত সকলে সবিশেষ মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন। মনে হয়েছিল যেন এক তরুণ ঋষিকুমার গান গাইছেন।”
কী সমাপতন! পরবর্তী কালে ভগিনী নিবেদিতা একটি চিঠিতে ইংরেজ কবি টি. এস. এলিয়টকে লিখেছিলেন— “স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ দুজনেই যেন সাক্ষাৎ ঋষি-কবি।”
প্রসঙ্গত বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ প্রথম দেখেন শ্রীরামকৃষ্ণকে ১৮৬৬ সালে। ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ থেকে জানা যায়, সেকালের ব্রাহ্ম সমাজের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে যেতেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও যেতেন ব্রাহ্ম সমাজের বিভিন্ন আমন্ত্রণে। রবি ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। ১৮৬৬ সালের এক সাক্ষাতের সময়ে বাবার সঙ্গে ৫ বছরের রবি ঠাকুরও ছিলেন। সেদিনই তিনি প্রথম দেখেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণকে।
এরপর ১৮৮৩ সালের ২ মে কলকাতার ৪ নম্বর নন্দনবাগানে কাশীশ্বর মিত্রের বাড়িতে ব্রাহ্মসমাজের উৎসব অনুষ্ঠানে আরও একবার এই ত্রয়ী মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেদিন রবি ঠাকুর এবং নরেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দ) দ্বৈত কণ্ঠে গান শুনিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে। গানগুলি ছিল— “গগনের থালে চন্দ্র সূর্য জ্বলে..”, “তোমারেই করিয়াছি জীবনেরও ধ্রুবতারা..” ইত্যাদি। এখানেও পিয়ানো বাজিয়েছিলেন রবি ঠাকুর এবং পাখোয়াজে সঙ্গতে ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত তথা স্বামী বিবেকানন্দ। খবরটি ৪ মে ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং স্বামী বিবেকানন্দের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও তাই।
রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ছিলেন, তবুও তাঁর অন্তরের শ্রদ্ধাসনে বিরাজমান ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। তার প্রামাণ্যতা পাওয়া যায় রবি ঠাকুরের লেখা ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসে। পাওয়া যায় ১৯৩৬ সালে শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি কবিতায়, যেখানে তিনি অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রতি। কবিতায় তিনি লেখেন—
“বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা,
ধ্যানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা;
তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে,
নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে;
দেশ-বিদেশের প্রণাম আনিল টানি,
সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।”
স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অন্তরের শ্রদ্ধার ইতিহাস তো এক কিংবদন্তি। বহুবার সারাবিশ্বের বিখ্যাত মনীষীরা ভারতবর্ষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দর্শনকে জানার জন্য রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ চাইতে গেলে তিনি বলতেন— “যদি ভারতবর্ষকে জানতে চান, চিনতে-বুঝতে চান, তাহলে স্বামী বিবেকানন্দের যাবতীয় সৃষ্টি অধ্যয়ন করুন। সেখানে এই ভারতবর্ষের সমস্ত ইতিবাচক দিকগুলি তিনি প্রাঞ্জলভাবে লিখে গেছেন যুক্তিযুক্ত মানদণ্ডের বিশ্লেষণের মাধ্যমে। সে এক অমূল্য সম্পদ..।”
সেদিক থেকে দেখতে গেলে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন এক অন্য অনন্যসাধারণ বিনিসুতোয় গাঁথা একখানি মালা। যে মালাখানির আর এক নাম আমাদের ভারতবর্ষের আত্মার পরমাত্মীয়— এক ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যময়, আধ্যাত্মিক সরলতা ও সহজতার প্রতিমূর্তি।