প্রথম পাতা খবর চৈত্রের গাজন থেকে পয়লা বৈশাখ: বাঙালির উৎসব, ঐতিহ্য ও নববর্ষের ইতিহাস

চৈত্রের গাজন থেকে পয়লা বৈশাখ: বাঙালির উৎসব, ঐতিহ্য ও নববর্ষের ইতিহাস

10 views
A+A-
Reset

মানুষের সভ্যতায় সংস্কৃতিই হলো মানুষের জীবনের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আকর্ষণের প্রতিবিম্ব।
মানুষ উৎসব, পালাপার্বণ ছাড়া জীবনযাপন করতে পারে না। আর প্রকৃতির সন্তান মানুষের জীবনে, সমাজে, ঘরে বাইরে পরিবর্তনশীল ঋতুবৈচিত্র্যের মধ্যেই নানান উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি ও তার পালন নিহিত থাকে।

শীত ধীরে ধীরে বিদায় নেওয়ার পরেই গ্রীষ্মের আগমনী সময়ের বার্তা নিয়ে আসে বসন্ত। আর বসন্তের অন্তিম মাস চৈত্রের সঙ্গী হয়ে আসে বৈশাখের আমন্ত্রণ, গ্রীষ্মের রৌদ্রস্নাত আবহাওয়ায়।

তবে যাবার বেলায় চৈত্র রেখে যায় তার বিদায়ের উৎসবের আয়োজন। চৈত্র মাসের প্রথম দিবস থেকে যার শুরু—গাজনের সেই আহ্বানে—”বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগি, মহাদেব..” আর তার সমাপন হয় সংক্রান্তিতে শিবের গাজন দিয়ে, শিবপূজার উৎসবের চড়কের মেলায়, নীলষষ্ঠীর পুজোয়। যেদিন মায়েরা সকল সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীল পুজোর ব্রত পালন করেন। পরের দিনই চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়কের শিবের পুজো, শিবের গাজন।

চৈত্র সংক্রান্তির রাত পেরোলেই পয়লা বৈশাখের সকালের আমন্ত্রণে আসে নববর্ষ। এই উৎসব সুপ্রাচীন। তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তার রূপ প্রকাশ পেয়েছে। যেমন ঊনবিংশ শতকের আগে এই নববর্ষের দিনের উৎসবটি “ভগবতী পুজা” নামেই পরিচিত ছিল। বাংলার ঘরে ঘরে পালিত হতো।

নতুন বছরের আবাহনে মেতে ওঠে প্রকৃতি, মেতে ওঠে বাঙালির মনপ্রাণ, সেই কোন সুদূর অতীত থেকে। সমাগত আগামী একটি বছর সমাজ, দেশ, ব্যক্তি জীবনের কল্যাণে, সৃজনে মানুষের মনে, ভাবনায় থাকত জানবার স্পৃহা। কারণ মানুষ অজানাকে জানতে চায়, সম্ভাবনার সম্ভাব্যতাকে বুঝতে চায়।

তাই পুরাতন সময়ে ঘরে ঘরে আসত পঞ্জিকা, এখনও আসে। লোকবিশ্বাস অনুসারে চৈত্রের দেবদেবী হলেন হর গৌরী। তাই চৈত্রের শেষে চড়কের গাজন পালা মিটলে খানিক অবসরে কৈলাসে পার্বতী শিবের কাছে আসন্ন বছরের সম্ভাব্যতার কথা শুনতে চান—
“কৈলাস ধামেতে বসি হর ও পার্বতী
সুশীতল সমীরণ বহে মন্দ গতি।
পার্বতী কহেন, প্রভু কহো ভগবান
নববর্ষের ফল করহ ব্যাখ্যান,
কত পোয়া ফল হবে কত পোয়া জল
সে কথা জানিতে বড় চিত্ত চঞ্চল।”

অতীতে বিভিন্ন জায়গায় চড়ক উপলক্ষে যে সব মেলা বসত, সে সব মেলা শেষ হতো পয়লা বৈশাখের দিন “গোষ্ঠযাত্রা” দিয়ে। মূলত কৃষ্ণলীলা, শিব-দুর্গার আখ্যানভিত্তিক এই আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায়। রাধাবল্লভের গোষ্ঠযাত্রার কথা তিনি বলে গেছেন।

ব্রাহ্ম সমাজে ঊনবিংশ শতকে নববর্ষের দিনটি উপাসনার মাধ্যমে পালিত হতো। রবীন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দ), শ্রী অরবিন্দ, কেশবচন্দ্র সেন, বিপিনচন্দ্র পাল, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখরা উপস্থিত থাকতেন।

নববর্ষের পয়লা বৈশাখের দিনটি পালিত হতো অবিভক্ত বাংলায়, আসামে, ত্রিপুরায়, উড়িষ্যায়, পাঞ্জাবে, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাটসহ উত্তর ভারতের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতেও। এমনকি আমাদের ভারতবর্ষের বাইরেও। আজও পালিত হয় সেই পরম্পরা।

আমাদের বাংলাতেই চড়কের পুজো নানা নামে পালিত হয়, যেমন—উত্তরবঙ্গে এর নাম “গমীরা”, মালদহে “গম্ভীরা”, মেদিনীপুর জেলায় “হাজরা পুজা”, দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগণায় কোথাও “চৈত্র পুজা”। বাংলা, আসাম, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা সহ সব জায়গাতেই চড়কের আগের দিন “নীলের পুজো” পালিত হয়। দক্ষিণ ভারতে পালিত হয় “চুড্ডেল” নামে, বেনারসে “কাপড়া চড়ক” নামে।

আর নববর্ষের দিনটি পালিত হয় আমাদের দেশে বাংলায় “পয়লা বৈশাখ”, পাঞ্জাবে “বৈশাখী” হিসেবে। দেশের বাইরে মায়ানমারে “থিংইয়ান”, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে “সংক্রান”, শ্রীলঙ্কা ও কম্বোডিয়ায় “খেমর”, নেপালে “বোশেখী”, লাওসে “সংক্রান পিমেই” নামে নববর্ষ উদযাপিত হয়। এইসব উৎসব প্রায় হাজার বারোশো বছরের প্রাচীন বলে জানা যায় ইতিহাস থেকে।

চৈত্র শেষে এবং বৈশাখের প্রথম দিনে এই যে আমাদের উৎসব—বিগত বছরকে বিদায় দিয়ে নববর্ষকে নতুন করে বরণ নেওয়ার ঐতিহ্যময় পরম্পরাগত রীতি—তাতে কেবল আনন্দ, উচ্ছ্বাস নয়, বরং সকলে মিলে সৃজনশীলতা ও সম্প্রীতির সম্পর্কের এক আন্তরিকতার স্নিগ্ধ পরশ।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.