মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যে ডেঙ্গি নজরদারি আরও জোরদার করার নির্দেশিকা জারি করল স্বাস্থ্য দফতর। বুধবারের নির্দেশিকায় গ্রাম, শহর ও মফস্সল—সর্বত্র বাড়ি বাড়ি গিয়ে জ্বরের রোগীর খোঁজ, উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত রক্তপরীক্ষা এবং ডেঙ্গির পাশাপাশি ম্যালেরিয়া পরীক্ষার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশ অনুযায়ী, আশাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জ্বরে আক্রান্তদের বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে। কোনও ব্যক্তির ৪৮ ঘণ্টার বেশি জ্বর থাকলে বিষয়টি বাধ্যতামূলক ভাবে এএনএম বা মেডিক্যাল অফিসারের নজরে আনতে হবে। জ্বরে আক্রান্তদের রক্তপরীক্ষার পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বও থাকবে স্বাস্থ্যকর্মীদের।
ডেঙ্গি পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিনামূল্যে পরিষেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকদের সমস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে এলিসা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। সরকারি পরিকাঠামো পর্যাপ্ত না থাকলে নিখরচায় বা কম খরচে বেসরকারি ল্যাবরেটরির মাধ্যমে ডেঙ্গি পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্য নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিশেষ প্রচার
ডেঙ্গির উপসর্গ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের রক্তপরীক্ষা করানোর জন্য ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাপক প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। পাশাপাশি ডেঙ্গি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যও প্রচার চালানো হবে।
প্রতিদিন কত জন জ্বরে আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গেল এবং তাঁদের মধ্যে কত জনের ডেঙ্গি পরীক্ষা হয়েছে, সেই তথ্য স্বাস্থ্য ভবনে রিপোর্ট আকারে পাঠাতে হবে। কোনও এলাকায় ডেঙ্গি আক্রান্তের সন্ধান মিললে সেখানে বিশেষ সাফাই অভিযান চালানোর পাশাপাশি সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎসস্থলও খুঁজে বার করতে হবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী মশা মারার ওষুধ ও থার্মাল ফগিং ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও এলাকায় জ্বরের প্রকোপ বাড়লে সেখানে ‘ফিভার ক্যাম্প’ চালু করতে হবে। জেলা, ব্লক এবং পুরসভা এলাকায় জ্বরের প্রকোপ ও সম্ভাব্য ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করতেও চিকিৎসা শিবির করার নির্দেশ রয়েছে।
সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ফিভার ক্যাম্প
স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশ অনুযায়ী, ‘ফিভার ক্যাম্প’ সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে মেডিক্যাল অফিসার, নার্স এবং মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
শুধু ডেঙ্গি নয়, জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের ম্যালেরিয়া পরীক্ষার উপরেও জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। অর্থাৎ কোনও রোগীর জ্বর দেখা দিলে ডেঙ্গির পাশাপাশি ম্যালেরিয়ার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্লেটলেট কমলে বাড়তি সতর্কতা
ডেঙ্গি আক্রান্তদের ক্ষেত্রে পরীক্ষার রিপোর্ট দ্রুত সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীকে জানাতে বলা হয়েছে। রক্তপরীক্ষার রিপোর্টে CBC, PCV-এর পাশাপাশি প্লেটলেটের মাত্রা উল্লেখ করতে হবে।
প্লেটলেটের সংখ্যা ৫০ হাজারের নীচে নেমে গেলে স্লাইড মেথডে রিপোর্টটি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও আক্রান্তকে হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন হলে দ্রুত পদক্ষেপ করতে হবে বলেও নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে।
‘নভেম্বর পর্যন্ত নজর’, বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
এর আগে মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ভবনে রাজ্যের ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকের পরে তিনি জানান, গত বছর এই সময় পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ৭,৬০০-রও বেশি ছিল। এ বার সেই সংখ্যা প্রায় ৪,০০০।
তবে পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “হইহই, গেল-গেল রব তোলার কোনও কারণ নেই।” ডেঙ্গির পাশাপাশি ম্যালেরিয়া নিয়েও অযথা আতঙ্ক না ছড়ানোর আবেদন জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, মুর্শিদাবাদের নওদা এবং নদিয়ার চাকদহের মতো কিছু ব্লকে এখনও ডেঙ্গির প্রকোপ রয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতির উপর নজর রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি আশাকর্মীদের সামান্য জ্বরকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলেন। পাশাপাশি আক্রান্তদের জন্য বিনামূল্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশও দেন। ডেঙ্গি সংক্রান্ত কোনও তথ্য আড়াল করা হবে না বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।