কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল কংগ্রেসের দফতরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ কয়েক জন দুষ্কৃতী দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। দফতরে থাকা কর্মীদের মারধর এবং তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার পর সরব হয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। হামলার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ করে দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। যদিও প্রকাশিত ফুটেজের সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি।
কালীঘাট তৃণমূলের অভিযোগ, ‘অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিজেপির গুন্ডারা’ ক্যামাক স্ট্রিটের দলীয় দফতরে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। দফতরে থাকা কর্মীদের মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয় বলে দাবি দলের। ফোন এবং ই-মেলের মাধ্যমে পুলিশকে ঘটনার কথা জানানো হলেও প্রায় দু’ঘণ্টা কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ অভিষেকের।
সমাজমাধ্যমে অভিষেক লেখেন, “আমাদের কর্মী এবং আইনজীবীরা বার বার ফোন এবং ই-মেল করার পরেও প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে পুলিশের কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। এটা চরম নিন্দনীয় এবং কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পুলিশের তরফে এই ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিজেপির পাল্টা দাবি, ‘সাজানো ঘটনা’
তৃণমূলের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন বরাহনগরের বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তাঁর দাবি, এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কেউ যুক্ত নন। তাঁর প্রশ্ন, ভোর সাড়ে ৪টের সময় তৃণমূলের কর্মীরা ওই দফতরে কী করছিলেন?
সজল ঘোষের অভিযোগ, প্রচারের আলোয় থাকার জন্য তৃণমূল নিজেরাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তাঁর কথায়, “দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কেউ যুক্ত নন। … এ সব সাজানো ঘটনা।”
‘পরিকল্পিত হামলা’, অভিযোগ তৃণমূলের
পরবর্তী সময়ে ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরে হামলাকে ‘পরিকল্পিত হামলা’ বলে অভিযোগ করেছে তৃণমূল। দলের দাবি, বুধবার রাতেই দিল্লি গিয়েছেন অভিষেক। তাঁর অনুপস্থিতির খবর পেয়েই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ কালীঘাট তৃণমূলের।
দলের আরও অভিযোগ, দফতর থেকে এয়ার পিউরিফায়ার, প্রিন্টার, টিভি-সহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
হামলার নেপথ্যে কারা রয়েছে, কারা তা সংগঠিত করেছে এবং কার নির্দেশে হামলা হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন অভিষেক। একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর পরেও পুলিশ কেন দ্রুত পদক্ষেপ করেনি, সেই বিষয়েও জবাবদিহি চেয়েছেন তিনি।
অভিষেকের প্রশ্ন, ভোররাতে অস্ত্র হাতে একদল লোক রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ঢুকে কর্মীদের উপর হামলা ও ভাঙচুর চালাতে পারলে এবং সেই সময়ে পুলিশ ব্যবস্থা না নিলে রাজ্যে আইনের শাসন কতটা কার্যকর রয়েছে।
তৃণমূলের ফেসবুক পেজ থেকেও ঘটনার পরে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, “দুষ্কৃতীরা অফিসের নকশা, প্রতিটি কোণ চিনলেন কী করে?” একই পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আগেই নজরে ক্যামাক স্ট্রিটের দফতর
গত কয়েক দিন ধরেই ক্যামাক স্ট্রিটের এই তৃণমূল দফতরকে ঘিরে একাধিক ঘটনা সংবাদ শিরোনামে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই দফতর থেকেই দলীয় কাজকর্ম পরিচালনা করেন।
গত বৃহস্পতিবার কলকাতা পুরসভার আধিকারিকেরা পুলিশের সঙ্গে সেখানে গিয়ে একটি তৃণমূলের নামাঙ্কিত বিলবোর্ড খুলতে চেয়েছিলেন। পুরসভার দাবি ছিল, বিলবোর্ডটি অবৈধ ভাবে বসানো এবং বিপজ্জনক ভাবে ঝুলছিল। সেই সময় পুরকর্মীদের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে অভিষেক ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে।
এর কয়েক দিন পর সোমবার ওই ভবনে যায় দমকল ও পুলিশ। ভবন নির্মাণের সময় জমা দেওয়া নকশার বাইরে কোনও ‘অবৈধ’ নির্মাণ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। বাইরের একটি শেড নিয়েও আপত্তি তোলা হয়।
পাশাপাশি ভবনের বেসমেন্টে পার্কিং ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করেন আধিকারিকেরা। পরিদর্শনের পর দমকলের তরফে কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে বলে জানানো হয়। ভবনের যে তলায় অভিষেকের দফতর রয়েছে, সেখানকার ফায়ার অ্যালার্ম নিয়েও সমস্যা পাওয়া গিয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।
একাধিক ঘটনাকে ঘিরে আগে থেকেই রাজনৈতিক চাপানউতোরের কেন্দ্রে থাকা ক্যামাক স্ট্রিটের তৃণমূল দফতরে এবার হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ নতুন করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করল। একদিকে তৃণমূলের সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ, অন্যদিকে বিজেপির দাবি—ঘটনাটি সম্পূর্ণ সাজানো। এখন পুলিশের তদন্তেই ঘটনার প্রকৃত ছবি স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা।