প্রথম পাতা খবর শতবর্ষের ভাব-উচ্ছ্বাসে ‘পথের দাবী’, যে উপন্যাসে ভয় পেয়েছিল ব্রিটিশ রাজ

শতবর্ষের ভাব-উচ্ছ্বাসে ‘পথের দাবী’, যে উপন্যাসে ভয় পেয়েছিল ব্রিটিশ রাজ

6 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবীতে সত্য ইতিহাসের এমনই দুর্ভাগ্য যে, তাকেও কখনও কখনও নিষিদ্ধ করা হয়। তবে সূর্যকে যেমন মিথ্যে মেঘের আড়াল দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না, তেমনই সত্যকেও কখনও মিথ্যার কুহক দিয়ে আড়াল করা যায় না।

বিশ্বের বহু মহৎ সৃষ্টি রাজশক্তির রক্তচক্ষুর কোপে, রাজরোষে পড়ে নিষিদ্ধতার তকমা পেয়েছে। সেই সক্রেটিসের যুগ থেকে গ্রিক সাহিত্যের হোমার, বাংলার দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ তথা ‘বন্দে মাতরম্’, স্বামী বিবেকানন্দের জাতীয়তাবাদ জাগরণের বাণী ও রচনা—এমন বহু সৃষ্টিই কোনও না কোনও সময়ে শাসকের রোষানলে পড়েছে। ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির পর বাঁকুড়ার এক অখ্যাত বাউল পীতাম্বর দাসের ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গান কিংবা সেই সময়ের বাংলার তাঁতিদের বোনা ‘বিদায় দে মা’ পাড়ের শাড়ি-ধুতিও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল।

১৯২৬ সাল। ঠিক একশো বছর আগে।

৩১ আগস্ট, ১৯২৬ (১৭ ভাদ্র, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হল আপাতনিরীহ একটি বই। পিচবোর্ডের মলাট, সাদা কাগজের উপর লাল কালিতে লেখা বইয়ের নাম। নিচে লেখকের নাম এবং প্রকাশকের নাম। ৪২৬ পাতার বই। দাম মাত্র তিন টাকা।

বইটির প্রথম সংস্করণে কয়েক হাজার কপি ছাপা হয়েছিল এবং প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়। বইটি হাতে পাওয়ার জন্য তখন বহু পাঠক কয়েক গুণ দাম দিতেও প্রস্তুত ছিলেন।

কিন্তু কী সেই বই, যার জন্য এমন আকর্ষণ?

বইটির নাম—‘পথের দাবী’
লেখক—শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

কীভাবে জন্ম নিল ‘পথের দাবী’?

শরৎচন্দ্র ১৯২৩ সালের দিকে এই উপন্যাসের লেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বভাব ছিল অত্যন্ত আপনভোলা। যাঁরা সৃষ্টি করেন, তাঁরা অনেক সময়ই সংসারের হিসাব-নিকাশ থেকে দূরে থাকেন, আনমনা হন। অনেকের কাছ থেকে, এমনকী ঘরের মানুষের কাছ থেকেও দু’-চার কথা শুনতে হয়। আমাদের এই লেখকও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।

লেখা শেষ না করেই তিনি পাণ্ডুলিপি ফেলে রেখেছিলেন বাড়িতে। সেই সময় শরৎচন্দ্রের কাছে বহু মানুষের যাতায়াত ছিল।

এমনই একদিন শরৎচন্দ্রের হাওড়ার শিবপুরের বাড়িতে এলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি ও তাঁর ভাইয়েরা ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

রমাপ্রসাদ শরৎচন্দ্রের লেখার টেবিলের উপর অযত্নে পড়ে থাকা একটি হাতে-লেখা পাণ্ডুলিপি দেখতে পান। কয়েকটি পাতা উল্টেপাল্টে দেখে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি বুঝতে পারেন, এটি একেবারেই নতুন ধরনের উপন্যাস।

রমাপ্রসাদ পাণ্ডুলিপিটি পত্রিকায় প্রকাশের জন্য শরৎচন্দ্রের কাছে চান এবং লেখাটি শেষ করার অনুরোধ জানান। শরৎচন্দ্র ছিলেন প্রচারবিমুখ মানুষ। প্রথমে অনীহা দেখালেও শেষ পর্যন্ত রাজি হন। এরপর ‘বঙ্গবাণী’-তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে ‘পথের দাবী’

তবে লেখাটি একটানা প্রকাশিত হয়নি; মাঝেমধ্যে কিস্তিতে বিরতিও পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯২৬ সালে বই আকারে প্রকাশ পায় উপন্যাসটি।

প্রথম সংস্করণের প্রকাশক ছিলেন উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বইটি কলকাতার কটন প্রেস থেকে মুদ্রিত হয়েছিল।

ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে

বই প্রকাশের পর থেকেই ব্রিটিশ প্রশাসনের নজরে আসে ‘পথের দাবী’। কলকাতার পুলিশ কমিশনারের রিপোর্ট এবং পরবর্তী সরকারি নথিতে উপন্যাসটির মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক উপাদান থাকার অভিযোগ তোলা হয়। অ্যাডভোকেট জেনারেলের মতামতেও বইটিকে বাজেয়াপ্তযোগ্য বলা হয়েছিল।

অবশেষে ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গীয় সরকার ‘পথের দাবী’ বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেয়। পরে সরকারি গেজেটেও সেই নিষেধাজ্ঞা প্রকাশিত হয়।

অর্থাৎ, বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই নিষিদ্ধ হয়নি—প্রকাশের কয়েক মাস পর, ১৯২৭ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ সরকার এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

বিপ্লবীদের হাতে হাতে ‘পথের দাবী’

ব্রিটিশ প্রশাসনের চোখে বইটির বিপজ্জনক দিক ছিল এর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বিপ্লবী চেতনা। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক বিপ্লবী আন্দোলনের কাহিনি। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে উপন্যাসটি তৎকালীন রাজনৈতিক আবহে বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছিল।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে, সেই সময় বিপ্লবী মহলে ‘পথের দাবী’ বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এমনকি ব্রিটিশ পুলিশি তল্লাশিতে বিপ্লবীদের কাছে গীতা এবং অন্যান্য জাতীয়তাবাদী সাহিত্যের পাশাপাশি এই বই পাওয়া যেত—এমন বিবরণও প্রচলিত হয়েছে।

বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর তার প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। নিষেধাজ্ঞার ফলে যে বইকে মানুষের হাত থেকে দূরে রাখার চেষ্টা হয়েছিল, সেটিই আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

সব্যসাচী কি কারও ছায়া?

‘পথের দাবী’-র নায়ক সব্যসাচীকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা হয়েছে। তাঁর চরিত্রে রাসবিহারী বসু কিংবা অন্যান্য বিপ্লবীর ছায়া রয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেছেন। তবে এটিকে সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তির প্রতিকৃতি হিসেবে দেখার পরিবর্তে উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র হিসেবেই দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

শরৎচন্দ্রের সময়ের রাজনৈতিক আবহ, বিপ্লবী আন্দোলন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যে এই চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, তা উপন্যাসের কাহিনি ও বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।

একশো বছর পরেও ‘পথের দাবী’

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ‘পথের দাবী’ প্রকাশের একশো বছর পূর্ণ হল। যে বই একসময় ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল, সেটিই আজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে আলোচিত।

বইটির উপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘদিন বহাল ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৯ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়, এবং সেই বছরই দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

একশো বছর আগে যে বইকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, তা আজও পাঠকের হাতে হাতে ঘোরে। সময় বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে। কিন্তু সাহিত্যের ভিতর দিয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, প্রতিবাদ এবং নিজের পথ বেছে নেওয়ার প্রশ্নটি এখনও প্রাসঙ্গিক।

সেই অর্থে নিষিদ্ধ উপন্যাস ‘পথের দাবী’ শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়—এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার দলিলও।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.