পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
সে অনেকদিন আগেকার কথা। বাংলা পত্র-পত্রিকার জগতে ইতিহাস সৃষ্টিকারী “বিদুষক” এবং “বোতল পুরাণ”-এর সম্পাদক শরৎচন্দ্র পণ্ডিত, যিনি দাদাঠাকুর হিসাবে বাঙলা ও বাঙালির কাছে অতি পরিচিত—সেই তিনি আর আমাদের ভোটের রঙ্গরসে বেশ মজে আছেন।
উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ। দাদাঠাকুর থাকতেন মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরের দফরপুরে। যাই হোক, সেই সময়ে হঠাৎ করে জঙ্গীপুর মিউনিসিপালিটি রাতারাতি ট্যাক্স বাড়িয়ে দিয়েছিল প্রায় তিনগুণ। চেয়ারম্যানকে ধরাধরি করেও তিনি কমালেন না ট্যাক্স। তখন দাদাঠাকুর নিজের পছন্দের এক ব্যক্তি—তেলেভাজার ব্যবসায়ী কার্ত্তিকচন্দ্র সাহাকে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড় করালেন। পরে তিনিই জিতেছিলেন। কিন্তু দাদাঠাকুর সেই কার্ত্তিকচন্দ্রের ভোটের প্রচারে তৈরি করেছিলেন একাধিক গান, যা আজও আমাদের কাছে অতি পরিচিত। সেগুলো হল—
“আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারি সাজিনু, ফিরি গো দ্বারে দ্বারে। / আমি ভিখারি না কি শিকারি গো…? // মোরে ‘হাঁ’ ছাড়া কেউ ‘না’ বলিল না, ক্যানভাস করিনু বারেবারে।” (কীর্তনের সুরে)।
আবার লিখলেন, ভোটের প্রতিশ্রুতির মতো—
“মাছ কুটলে মুড়ো দেব / গাই বিয়োলে দুধ দেব / দুধ খাবার বাটি দেব / সুদ দিলে টাকা দেব / ফি দিলে উকিল দেব / চাল দিলে ভাত দেব / কিন্তু ভোটার বলে, মিটিংয়ে যাব না, অবসর পাব না / কোনও কাজে লাগবও না / শুধু ভোটার বাপু তোরা আমার যাদুর কপালে বাবা ভোট দিয়ে যা / ভোট দিয়ে যা, আয় ভোটার আয়, আমার যাদুর কপালে তোরা বাপু ভোট দিয়ে যা।”
এই দাদাঠাকুরই আবার ব্যঙ্গ করে লিখছেন—
“আমি নেতা না কি অভিনেতা? // হেথা মালুম করিবে কে তা?”
প্রহসনের মতো লিখলেন—
“চলেছি ভাই করিব ‘উইন’-রে / দোহাই ভোটার কোরোনা ‘রুইন’-রে।”
অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের বিধানপরিষদের নির্বাচন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তখন কলকাতা করপোরেশনের মেয়র। তাঁর অনুরোধে দাদাঠাকুর লিখলেন—
“এ মেলে, ও মেলে, বলেই তো বাপু আপনারা হন এম.এল.এ. / আপনারা দেশের ‘নেতা’ হ্যায় (মানে নিতে জানেন), কিন্তু ‘দেতা’ নন (মানে দিতে জানেন না)”।
বহরমপুরের মিউনিসিপালিটির ভোট। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী—রমণীমোহন সেন এবং নীলমণি ভট্টাচার্য। ভোট হল। দাদাঠাকুর ভোটের আগেই কয়েকজন ঘনিষ্ঠকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ফলাফল বেরোতে দেখা গেল, তা হুবহু মিলে গেছে। জিতেছে রমণী, হেরেছে নীলমণি। এবার সবাই ধরল দাদাঠাকুরকে—”কী করে বললেন?” উত্তরে রসিক দাদাঠাকুর হেসে হেসে বলেছিলেন—”আরে বাপু, সবই টাকার খেলা হে ভাইসব। ‘Raw-money’-র সঙ্গে ‘Nil-money’ পারবে কেন? একজনের ‘র’ টাকা, আরেকজনের ‘নীল’ টাকা—নামেই তো সব রয়েছে গো। নেই?”
প্রসঙ্গক্রমে আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এখন ভোটের মরশুম। ভোট এলেই চারিদিকে সাজো-রব, শান্তি-অশান্তির কমবেশি সহাবস্থান। এটা অবশ্য আজকের ব্যাপার নয়। আজ থেকে একশো বছর আগেও কমবেশি ছিল। তাই তো ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে স্টার থিয়েটারের জন্য “দ্বন্দ্বে মাতনম্” নামের হাসির নাটকে রসরাজ অমৃতলাল বসু লিখেছিলেন—
“তেত্রিশ কোটীর ওপর ঠাকুর তুমি ভোটেশ্বরী / নারদ ঋষির মানস-কন্যা দম্ভে লম্বোদরী / আত্মবন্ধু প্রীতি যথা থাকে গলাগলি / তোমার দৃষ্টি, সৃষ্টি তথায় শুরু করে দলাদলি।”
ভোট প্রক্রিয়াকে ব্যঙ্গ করে লেখা এই নাটকটিতে লোভ এবং ভয় দেখিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার যে ছবি রয়েছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তবে দাদাঠাকুর, রসরাজ—এঁরাই প্রথম নন। এঁদেরও কয়েক দশক আগে, ১২৮৯ বঙ্গাব্দে মহাকবি গিরিশচন্দ্র ঘোষ কলকাতা পৌরসভার ভোটের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন “ভোটমঙ্গল” কাব্য।
খোলা মাঠের জায়গায় নতুন বাড়ি তোলা বন্ধ করা, চব্বিশ ঘণ্টা জল এবং রাস্তায় আলো দেওয়ার মতো অতি চেনা প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রার্থীদের জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার প্রবণতাও ব্যঙ্গ করে লেখা ছিল সেই কাব্যে।
তবে অতীতে রাজনৈতিক কদর্যতার পাশে সৌজন্যের অনন্য দৃষ্টান্তও ছিল। আজকের রাজনীতিতে মতান্তর মানেই যেখানে মনান্তর এবং বৈরিতা, তা কিন্তু সেই সময়ে ছিল না। থাকাটা উচিতও নয়, কাম্যও নয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ-এর রাজনীতির বিরোধী ছিলেন তাঁরই জেঠতুতো ভাই সতীশরঞ্জন দাশ।
একবার কলকাতার বড়বাজার কেন্দ্র থেকে সতীশবাবু প্রার্থী হলেন। তাঁর বিপক্ষে দেশবন্ধু এক অনামী ব্যক্তি সাতকড়িপতি রক্ষিতকে দাঁড় করালেন। ভোটের দিন চিত্তরঞ্জন দাশ প্রতিটি পোলিং বুথের সামনে নীরবে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ভোটাররা তাঁকে দেখেই ভোট দিলেন। ফলে হেরে গেলেন সতীশরঞ্জন। তবুও কোনও মনোমালিন্য ছিল না। বরং বাংলার উন্নয়নে সতীশ সর্বতোভাবে দাদা চিত্তরঞ্জনকে সহযোগিতা করেছেন।
এই রকমই আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনে। প্রথমবার ভোটে দাঁড়িয়েছেন বিধানচন্দ্র রায়। প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন প্রবীণ রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচারের জন্যে এক সময়ে বিধানচন্দ্র গেলেন সুরেন্দ্রনাথের কট্টর সমর্থক, পানিহাটির জমিদার শিবচন্দ্র রায়চৌধুরীর কাছে, তাঁরই বৈঠকখানায়। বিধানচন্দ্রের পরিচয় পেয়ে এবং শুনে তো তিনি অগ্নিশর্মা। ক্রুব্ধ হয়ে শিবচন্দ্র বললেন-“বিধানবাবু আপনি এম.ডি. ন’ন, আপনি আসলে ‘ম্যাড ডগ’।” শিবচন্দ্রের সেই কথা শুনে বিধানচন্দ্র নামমাত্রও বিচলিত হলেন না, বরঞ্চ উত্তরে বিনম্রতায় বললেন, “আমার পাগলামির ওষুধ তো আপনার হাতেই,দয়া করে ভোটটা দেবেন আমায়।” এমন রসবোধ আর সৌজন্যে শিবচন্দ্রের রাগ পড়ে যায় আর বিধানচন্দ্রের ব্যবহারে মোহিত হয়ে গিয়ে সেদিন বিধানচন্দ্রকে সাদর সম্মানে আপ্যায়ন করেছিলেন শিবচন্দ্রবাবু তখনকার দিনের কলকাতার ভীমনাগ,নকুড় ঘোষ,আর দ্বারিক ঘোষ-এর বিখ্যাত সন্দেশ দিয়ে।
গত ১০০–১৫০ বছরে ভোটের কৌশল খুব না বদলালেও রাজনীতির সৌজন্যবোধ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। আমাদের ইতিহাসই প্রমাণ করে—পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহিষ্ণুতা ও রসবোধই সুস্থ গণতন্ত্রের মূল অলঙ্কার।
আজকের প্রতিবেদনে সেই আবেদন—আমরা যেন সেই ঐতিহ্য বজায় রাখি। ভয়ভীতি ও রক্তপাতহীন, সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে।
সকলেই নিজের ভোট নিজে দিন। ভালো থাকুন, একে অপরকে ভালোবাসুন, শ্রদ্ধা করুন, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। এটাই আমাদের সংস্কৃতি, এটাই আমাদের ঐতিহ্য।