পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয় এক সত্যের মুখোমুখি এবারের ২৫ শে বৈশাখ। বাংলা তথা ভারতবর্ষ, এশিয়া এবং সারা বিশ্বের অতি আপনজন রবীন্দ্রনাথের ১৬৫তম জন্মদিবস আহ্বান জানিয়ে গেল— “দেখা দিক আর বার জন্মেরও প্রথম শুভক্ষণ, ২৫ শে বৈশাখ”।
মানবিক ঔদার্য এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মনস্কতার রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যে কোনও কূপমণ্ডূকতার ঘোরতর বিরোধী। উদার বিশ্বমানবতার পথপ্রদর্শক রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনদর্শনে ধর্ম-বর্ণ, জাত-পাত, উচ্চ-নীচ, ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক কোনও সঙ্কীর্ণতাকে স্থান দিতেন না। বরঞ্চ ঘৃণা করতেন, প্রতিবাদে সোচ্চার হতেন। কখনও কোনও হিংসা, অসহিষ্ণুতা, ভেদ-বিভেদের বিভাজনকে প্রশ্রয় দেননি। রবীন্দ্রনাথের চোখে মানুষ শুধুই মানুষ। তিনি সারাজীবন এই ভেদবিভেদের বিরুদ্ধে গিয়ে বিভিন্নতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের প্রয়াসী ছিলেন, পথিকৃৎ ছিলেন। ভারতবর্ষকে তিনি বহুত্বের মহামিলনক্ষেত্র হিসাবে দেখেছেন। দেশভাগের বিরুদ্ধে তিনি পথে নেমেছেন, ডাক দিয়েছেন— “হে মোর চিত্ত, পূণ্য তীর্থে জাগোরে ধীরে,/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।”
আজ আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করতে চাই, উচ্চারণ করতে চাই— “অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো,/ সকল দ্বন্দ্ব-বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো, সেই তো তোমার ভালো।”
আমাদের চেতনায় যেমন আছেন কাজী নজরুল ইসলাম, ঠিক সেই চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে, আমাদের হৃদয়ে, আমাদের ভিতর-বাহিরে, অন্তরে অন্তরে বিরাজমান হয়ে সদা জাগ্রত রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
আজ ঠিক এই সময়ে, আমাদের সমাজে, দেশে, সংস্কৃতিতে, যখন হিংসা, বিভেদ, স্বার্থপরতা, অসহিষ্ণুতা ও অসততার জোরজবরদখল চলছে, তখন আমাদের বড়োই প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথের মানবিকতার বাণী, সমতার আহ্বান, বলিষ্ঠতার অঙ্গীকার। তাই আমাদের চেতনায়, আমাদের চিন্তায় বেঁচে থাকুন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের এই “এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার”-এর ন্যায় এক অস্তিত্বের সংকটে রবীন্দ্রনাথ আমাদের নূতন পথের দিশারী হোন। তিনিই আমাদের পাথেয় হোন। আমাদের পথের সন্ধান দিন।
রবীন্দ্রনাথ তাই আমাদের বলে দেন—
“সংকোচের বিহ্বলতা, নিজেরে অপমান,/ সংকটের কল্পনাতে হয়ো না ম্রিয়মাণ।//
মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।//
দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো,/ নিজেরে দীন নিঃসহায় যেন কভু না জানো,//
মুক্ত করো ভয়,/ নিজের ’পরে করিতে ভর, না রেখো সংশয়।” আত্মবলে বলীয়ান হয়ে শত বিপদ-ঝঞ্ঝাকে জয় করতেই হবে— এই হোক এই সময়ের দাবি। আজকের এই সময়ের অঙ্গীকার।