মালদহের রাজনীতিতে ফের বড়সড় সমীকরণ বদল। প্রয়াত বরকত গনি খান চৌধুরীর ভাগনি, সদ্য প্রাক্তন তৃণমূল রাজ্যসভার সাংসদ মৌসম বেনজির নূর শনিবার দিল্লিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিলেন। কংগ্রেস সদর দফতর, ২৪ আকবর রোডে গিয়ে ‘হাত’ প্রতীকে ফেরার মাধ্যমে কার্যত ‘ঘর-ওয়াপসি’ করলেন মৌসম।
জেলার রাজনৈতিক মহলের মতে, এই দলবদলের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ— আগামী এপ্রিল মাসে মৌসমের রাজ্যসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সেই মেয়াদ শেষে তিনি তৃণমূলের তরফে ফের প্রার্থী হবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি মালদহ জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ চলছিল। বিভিন্ন ‘ছোট ছোট’ ইস্যুতে ব্যক্তি স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় জেলায় রাজনৈতিক ভাবে কোণঠাসা হচ্ছিলেন তিনি।
এর পাশাপাশি গত লোকসভা নির্বাচনে দাদা ইশা খান চৌধুরী-র হয়ে প্রকাশ্যে প্রচার করায় দলের অন্দরেও অস্বস্তি তৈরি হয়। সূত্রের দাবি, সেই সময় থেকেই বিধানসভা ভোটের আগে কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন মৌসম। মালদহ জেলা থেকে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিট প্রায় নিশ্চিত— এমন ধারণা স্পষ্ট হওয়ার পরই তিনি দলবদলের সিদ্ধান্ত নেন।
২০১৯ সাল থেকে প্রায় সাত বছর ধরে প্রয়াত গনি খান চৌধুরীর কোতোয়ালি ভবন কার্যত দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। রাজনৈতিক দড়ি টানাটানিতে খানদানেই তৈরি হয়েছিল বিভেদ। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সেই বিভাজন মেটাতেই এবার পতাকা বদল করলেন গনির ভাগনি।
তৃণমূল ছাড়ার পর জেলা রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। তৃণমূলের মালদহ জেলা যুব সভাপতি প্রসেনজিৎ দাস বলেন, “মৌসম কংগ্রেসেই ছিলেন। তৃণমূলে এসে অনেক কিছু পেয়েছেন, রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন। এখন হয়তো আরও বেশি কিছু চাই।”
জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান চৈতালি সরকার বলেন, “বরকত সাহেবকে আমরাও শ্রদ্ধা করি। মৌসম কেন দল ছাড়লেন, তা স্পষ্ট নয়। এর প্রভাব জেলার রাজনীতিতে কতটা পড়বে, সেটা সময়ই বলবে।”
অন্যদিকে বিজেপি নেতা বিশ্বজিৎ রায় কটাক্ষ করে বলেন, “তৃণমূল কাউকে সম্মান দিতে জানে না। মৌসম সম্মান পাননি, গনি খান চৌধুরীকেও দেয়নি। এভাবেই তৃণমূল দলটা শেষ হয়ে যাবে।”
ইংলিশবাজার পুরসভার চেয়ারম্যান কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী বলেন, “রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে মৌসম কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ করেননি। কংগ্রেসের টিকিট পাবেন বলেই দল ছাড়লেন। এতে তৃণমূলের কোনও ক্ষতি হবে না।”
অন্যদিকে কংগ্রেস শিবিরের দাবি, ফাঁকা মাঠে গনি খান চৌধুরীর উত্তরসূরি তৈরি করা সহজ নয়। তবে মৌসমের কংগ্রেসে ফেরায় কোতোয়ালি ভবনের বিভাজন মিটবে বলে আশাবাদী মালদহ দক্ষিণের সাংসদ ইশা খান চৌধুরী। মৌসমের ঘনিষ্ঠ মহলের অভিযোগ, জেলা তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী না করায় সেই ক্ষোভ আরও বেড়েছিল।
সব মিলিয়ে বিধানসভা ভোটের মুখে মৌসম নূরের এই দলবদল মালদহের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়াল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।