প্রথম পাতা খবর সিঙ্গুরে ফিরছে শিল্প? অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা, নতুন শিল্পনীতিতে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

সিঙ্গুরে ফিরছে শিল্প? অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা, নতুন শিল্পনীতিতে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

2 views
A+A-
Reset

দীর্ঘ বিতর্ক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের স্মৃতি পেরিয়ে ফের শিল্পের আলোচনায় হুগলির সিঙ্গুর। সেখানে নতুন করে শিল্পস্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ভারী বাণিজ্যিক গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিউটাউনে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করার পর মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য ঘিরে শিল্পমহলে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সিঙ্গুরে শিল্পস্থাপনের জন্য সরকার উদ্যোগী। তবে শুধুমাত্র সমঝোতাপত্র বা MoU স্বাক্ষর করে প্রচার পাওয়ার উদ্দেশ্য তাঁদের নেই। বাস্তবে শিল্প গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা হলেও এখনও কোনও চূড়ান্ত চুক্তি বা বিনিয়োগের ঘোষণা হয়নি।

ন্যানো প্রকল্প ঘিরে আন্দোলন, সিঙ্গুর ছেড়েছিল টাটা

সিঙ্গুরে শিল্পায়নের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীর ন্যানো গাড়ি তৈরির কারখানা গড়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর টাটা গোষ্ঠী সিঙ্গুর থেকে প্রকল্প সরিয়ে নেয়। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় তৃণমূল সরকার। ফলে সিঙ্গুরে শিল্পায়নের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।

এবার রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সিঙ্গুরে শিল্প ফেরানোর বিষয়ে নতুন করে তৎপরতার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কৃষকদের উপর গুলি চালানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে দেওয়া হবে না।

অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা

সিঙ্গুরে কী ধরনের শিল্প হতে পারে, তার ইঙ্গিত দিতে গিয়ে অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। সংস্থাটি ভারী বাণিজ্যিক গাড়ি প্রস্তুত করে। তবে সেখানে ঠিক কী ধরনের উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি হতে পারে, কত বিনিয়োগ আসতে পারে কিংবা কত কর্মসংস্থান হবে—সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, রাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। তাঁর দাবি, বর্তমানে রাজ্যে প্রায় দু’কোটি শিক্ষিত বেকার রয়েছেন এবং কাজের সন্ধানে ৭০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিন্‌রাজ্যে গিয়েছেন। শিল্পস্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।

নতুন শিল্পনীতিতে বড় আর্থিক সুবিধার ঘোষণা

নতুন শিল্পনীতিতে বিভিন্ন ধরনের শিল্পের জন্য আর্থিক সহায়তা ও উৎসাহ ভাতার কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বড় শিল্পের জন্য বিশেষ প্যাকেজ থাকবে। নির্দিষ্ট শর্তে সংস্থাগুলিকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে শিল্পসংস্থাগুলি বিশেষ সুবিধা পাবে। উৎপাদনকারী ইউনিটগুলির ক্ষেত্রে এসজিএসটি-র উপরেও আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে। মহিলা কর্মীদের নিয়োগে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি কর্মরত মহিলাদের জন্য হস্টেল তৈরিতে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও বিনিয়োগে উৎসাহ

নতুন শিল্পনীতিতে হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধার কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০০ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যাম্প ডিউটি ছাড়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি পরিষেবা ক্ষেত্রকেও নতুন নীতির আওতায় আনার কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার। অনগ্রসর এলাকায় কারখানা গড়লে অতিরিক্ত উৎসাহ ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন, সবুজ বিদ্যুৎ এবং গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যতের শিল্পায়নের কথা মাথায় রেখে ১৫টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে কী পরিমাণ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে, তার বিস্তারিত শর্ত ও যোগ্যতা জানতে নতুন শিল্পনীতির পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর থাকবে।

বকেয়া উৎসাহ ভাতা নিয়েও আশ্বাস

শিল্পসংস্থাগুলির বকেয়া উৎসাহ ভাতার বিষয়টিও উঠে এসেছে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে বকেয়া ভাতা মিটিয়ে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে এ বিষয়ে এখনই কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন।

এদিন পণ্যবাহী লরির অতিরিক্ত পণ্য পরিবহণ বা ওভারলোডিং বন্ধ করার জন্যও শিল্পপতিদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

সব মিলিয়ে নতুন শিল্পনীতির ঘোষণার পাশাপাশি সিঙ্গুরে শিল্প ফেরানোর সম্ভাবনার কথা সামনে এনে রাজ্যের শিল্পায়ন নিয়ে নতুন বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা কতটা এগোয় এবং সিঙ্গুরে বাস্তবে কবে শিল্পস্থাপনের কাজ শুরু হয়, এখন সেটাই দেখার।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.