পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
বাঙালি মাঝে মধ্যেই গুনগুন করে মনে মনেই গেয়ে ওঠে -“চলো না দিঘার সৈকত ছেড়ে ঝাউবনের ছায়ায় ছায়ায়,শুরু হোক পথ চলা,শুরু হোক কথা বলা”।
সুন্দরী সমুদ্র সৈকত দিঘার অনন্যসাধারণ রূপ বাঙালী তথা দেশে বিদেশের ভ্রমন পিয়াসী মানুষকে আকর্ষণ করে বারেবার,চিরকাল। আসলে “ভ্রমন” এর আর এক মানে তো এভাবেও করা যায় “ভরো মন” তোমার মনের একতারায়,
দৃষ্টিনন্দনের নৈসর্গিকতার আনন্দধারায়,অজানাকে জানার আনন্দের মধ্য দিয়ে,অচেনাকে চেনার খুশীর মধ্য দিয়ে।
কিন্তু এই দিঘার এক ভালোবাসার ইতিহাস আছে,যা হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা।সেই অজানাকেই জানতে গিয়েই জানতে পারি সুন্দরী দিঘার এক “প্রেমিক সাহেব”-এর কথা।
ইংল্যান্ডের মিডলসবোরোর অধিবাসী এক ইংরেজ ব্যবসায়ী জন ফ্রাঙ্ক স্নেইথ্( ১৪.৮.১৮৮২/
১৮.১২.১৯৬৪) ইংল্যান্ড থেকে ব্রিটিশ শাসনকালে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতে তথা কলকাতায় এসে ডালহৌসিতে “হ্যামিল্টন জুয়েলারি” নামে একটি দোকান খোলেন। সেই দোকানে তখনকার দিনের সমাজের বহু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা আসতেন। স্বাভাবিকভাবেই সাহেবের সাথে তাদের পরিচয়,ঘনিষ্ঠতা,
অন্তরঙ্গতাও তৈরী হয়। এইভাবেই মেদিনীপুর জেলার কাঁথি,রামনগর,শহর হয়ে বীরকুল,বাজকুল,
বালিসাই অঞ্চলের তৎকালীন বারো ভুঁইয়াদের সঙ্গেও সাহেবের পরিচয় হয়।
দিন যায়,মাস যায়,এক সময়ে একবার গরমের সময়ে নিজের দেশ ইংল্যান্ডের ব্রাইটন শহরে গিয়ে “সামার সিজন্” কাটানোর বাসনা প্রকাশ করেন সাহেব।সেই সময়ে সেই পরিচিত বারো ভুঁইয়াদের কয়েকজন সাহেবকে মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরভূমিতে সুদীর্ঘ বিস্তির্ন বালুকাবেলায় সারিসারি ঝাউবন,শাল পিয়ালের বিথী,কেয়াফুলের ঝোপঝাড় আর নানাবিধ গাছগাছালীতে ঘেরা বীরকুল,বীরসাই,এলাকার শান্ত,স্নিগ্ধ, একান্ত নিরিবিলি পরিবেশের সন্ধান দেন।
এই বীরকুল আজ আর নেই,সমুদ্র গ্রাস করে নিয়েছে।কারণ বঙ্গোপসাগর অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। এই বীরকুলেই ১৭৮০ সালে সস্ত্রীক “সামার সিজন” কাটাতে এসেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিস।এখানে হেস্টিংসের একটা বাড়িও ছিল,যা আজ আর নেই। এই তথ্য পাওয়া যায় তখনকার “বেঙ্গল গেজেট”-এ। ওয়ারেন হেস্টিংস এই জায়গাটির নাম দিয়েছিলেন ” ব্রাইটন অফ ক্যালকাটা”।
যাইহোক, তখন এই এলাকাতে যাতায়াতের পথ ছিল
ঘোড়ার জুড়িগাড়িতে। পরে রেলপথ চালু হলে হাওড়া থেকে ট্রেনে বেলদা, সেখান থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে কাঁথি ডাকবাংলো, তারপর পিছাবনি,সেখান থেকে স্থানীয় বারো ভুঁইয়াদের ব্যবস্থাপনায় রাজকীয় হাওদায় হাতির পিঠে চড়ে স্নেইথ সাহেব পৌঁছে যেতেন সেই স্নিগ্ধ মনোরম স্থানে–“ব্রাইটন অফ ক্যালকাটা”-তে।
১৯২৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ১১.৫ একর জমি লিজ নেন জন স্নেইথ সাহেব,ততদিনে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি এই জায়গার। জমি লিজ নিয়ে চারদিকে ঢাল রেখে মাঝখানে একটি বড় টিলার ওপরে নিজের জন্যে একটি সুন্দর মনোরম বাসস্থান গড়ে তোলেন সাহেব। সেই বাসস্থানের স্থাপত্যশৈলী এক অনন্যসাধারণ শিল্প। সেটি এখন গোবিন্দবসন নামের একটি গ্রামে। বাড়িটি ১৯৩৯ সালে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়,তখন সাহেব তার নাম দেন-“র্যান্সউইক হাউস”। কলকাতার হ্যামিল্টন জুয়েলারি কোম্পানির শোরুমের প্রবেশদ্বারে দুটি সাদা মার্বেল পাথরের হাতির প্রস্তর মুর্তি রাখা থাকতো – যা ছিল কোম্পানীর শ্রীবৃদ্ধির সৌভাগ্য প্রতীক,-সেই দুটি কলকাতা থেকে নিয়ে গিয়ে সেই বাংলোর সামনে বসানো হয়,সাহেবের ইচ্ছাতে। সেগুলি আজও রয়েছে সেখানেই।
স্নেইথ সাহেব পরে এক সময়ে কলকাতা থেকে নিজের উড়োজাহাজ-এ চড়ে আসতেন দিঘাতে।
সমুদ্র সৈকতের দীর্ঘ বালুকাবেলায় স্থানটি অবস্থিত বলেই বোধহয় তার নাম হয়ে যায়-“দীঘল” বা “দিঘা”।
পরে স্নেইথ সাহেবের ইচ্ছা অনুযায়ী তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় নিজে উদ্যোগ নিয়ে দিঘার আধুনিকীকরণ করেন।
যাইহোক,সাহেব জন ফ্রাঙ্ক স্নেইথ আজীবন ভালোবাসায় জড়িয়ে ছিলেন এই সুন্দরী দিঘার। এমন কি সাহেব ইচ্ছা প্রকাশও করেছিলেন যে সাহেবের মৃত্যুর পরে সাহেবকে যেন সেই র্যান্স উইক হাউসেই সমাধিস্থ করা হয়।
১৯৬৪ সালের ১৮ই ডিসেম্বর সাহেব তাঁর প্রেমিকা সুন্দরী দিঘার বুকেই চির দিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েন।আজও তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত সেই প্রেমিকা দিঘার বুকেই। জন ফ্রাঙ্ক স্নেইথ সাহেবের গভীর নিবিড় নিস্তব্ধতায় জড়িয়ে থাকা ভালোবাসার নাম ” দিঘা, সুন্দরী দিঘা”।