তুষারধসের জেরেই কি বুধবার ভয়াবহ হড়পা বান নেমেছিল নেপালের ভোটেকোশী নদীতে? প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এমনই সম্ভাবনার কথা বলছেন ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ। তাঁদের অনুমান, তুষারধসের জেরে পাথর ও বরফের স্তূপে লেহন্দে নদীর গতিপথ আটকে যায়। ফলে নদীতে জল জমতে থাকে। পরে প্রবল জলের চাপে সেই প্রাকৃতিক ‘অবরোধ’ আচমকা ভেঙে পড়তেই বিপুল জলরাশি নেমে আসে ভোটেকোশীতে। সেখান থেকেই ভয়াবহ হড়পা বানের সৃষ্টি বলে মনে করা হচ্ছে।
বুধবার সকালে চিন সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলায় আচমকাই ভয়াবহ জলস্রোত নেমে আসে। প্রাথমিক তদন্তে তুষারধসের পাশাপাশি হিমবাহের বরফগলা জলে তৈরি কোনও হ্রদ ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল জানিয়েছেন, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তুষারধস এবং প্রায় ৮টা ৪০ মিনিট নাগাদ ভোটেকোশীতে হড়পা বান শুরু হয় বলে সরকারের কাছে থাকা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা USGS-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় তিব্বতীয় ভূখণ্ডে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। ভূমিকম্পের সঙ্গে তুষারধসের যোগ ছিল কি না, তা এখনও তদন্তাধীন। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, ভূমিকম্পের কম্পনে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ-পাথরের স্তূপ অস্থিতিশীল হয়ে তুষারধস নামতে পারে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের মতে, লেহন্দে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিপুল পরিমাণ জল জমেছিল। পরে সেই জল বাধা ভেঙে প্রবল বেগে ভোটেকোশীতে নেমে আসায় বিপর্যয় ঘটে থাকতে পারে। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশও জানিয়েছেন, হড়পা বানের জল তিব্বতের দিক থেকেই নেমে এসেছিল।
নিখোঁজ ৩৮৪, শতাধিক ভারতীয়
হড়পা বানের জেরে রাসুয়া ছাড়াও নুয়াকোট ও সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নদীর স্রোতে ভেসে গিয়েছে বাড়িঘর, গাড়ি, রাস্তা ও সেতু। একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৩৮৪ জন পর্যটক ও যাত্রীর এখনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের নাগরিকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি—প্রাথমিক তালিকায় ১০৫ জন ভারতীয়ের নাম রয়েছে। তালিকাটি এখনও যাচাই করা হচ্ছে এবং সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তাবাহিনী এবং পর্যটন সংস্থাগুলি যৌথভাবে নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করছে। বহু যাত্রী কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার পথে ওই অঞ্চলে ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
গত বছরও একই নদীতে হড়পা বান
ভোটেকোশী অঞ্চলে এমন বিপর্যয় অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়েও একই এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বান হয়েছিল। সেই সময়ের অনুসন্ধানে নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহ-উৎসারিত হ্রদ ফেটে গিয়ে লেহন্দে নদীতে আচমকা জল নেমে আসার সম্ভাবনা উঠে এসেছিল। এবারের ঘটনাতেও তাই হিমবাহ ও বরফের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে বুধবারের ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ২০১৯ সালে Science Advances-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৭৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত হিমালয়ের ৬৫০টি হিমবাহের বরফক্ষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৫-২০০০ সালের তুলনায় ২০০০-২০১৬ সময়ে বরফ গলার গড় হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
গবেষণায় ১৯৭৫-২০০০ সময়ে হিমবাহের গড় বরফক্ষয়ের হার ছিল বছরে প্রায় ০.২২ মিটার জল-সমতুল্য, যা ২০০০-২০১৬ সময়ে বেড়ে প্রায় ০.৪৩ মিটারে পৌঁছেছিল। গবেষকদের মতে, আঞ্চলিক উষ্ণায়নই এই ত্বরান্বিত বরফক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
ফলে নেপালের এই ভয়াবহ হড়পা বানের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে তুষারধস ও সম্ভাব্য ভূমিকম্পের ভূমিকা সামনে এলেও, হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তিত পরিবেশ ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।