পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
বাংলা তথা সারা ভারত তথা সমগ্র বিশ্বে মহানায়ক উত্তমকুমার হলেন এক যুগোত্তীর্ণ এবং কালোত্তীর্ণ চলচ্চিত্র অভিনেতা। একথা সর্বজনবিদিত। কিন্তু তাঁর অজানা দিকও ছিল, যা অবশ্যই সমানভাবে উল্লেখযোগ্য এবং স্মরণীয়-বরণীয়।
তিনি অভিনেতা হিসাবে যেমন চিরভাস্বর, তেমনই তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ সুরকার, গায়ক, কবি। তার প্রমাণ পাই বাংলা সিনেমা “কাল তুমি আলেয়া” ছবিতে (১৯৬৬)। তাছাড়াও পাই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস “পথের দাবী” অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র “সব্যসাচী” সিনেমাতেও সঙ্গীত পরিচালনার অনন্য প্রতিভা।
এই নিবন্ধে উত্তমকুমারের কয়েকটি অজানা কথা তাঁরই জন্মশতবর্ষ উদযাপনে বিনম্র শ্রদ্ধায় লিপিবদ্ধ করা হল।
মহানায়ক খুব ভালো গায়ক ছিলেন। একথা অনেকেই জানেন। জীবনের প্রারম্ভে তিনি সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন সে যুগের অত্যন্ত বিদগ্ধ সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। নিয়মিতভাবে নিষ্ঠার সাথে সঙ্গীত শিখেছিলেন। তিনি ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, ঠুংরি, প্রভৃতি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিমও নিয়েছিলেন।
এছাড়াও, উত্তমকুমারের একই পাড়ার অন্তরঙ্গ বন্ধু ডাক্তার লালমোহন মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা থেকে জানতে পারি যে, ১৯৪৬-৪৭ সালে সেই সময়ের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সময়ে, মহানায়ক তখন ভবানীপুরের সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং চপলা দেবীর বড় ছেলে অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবক। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যে এবং ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে নিজেই একটি গান লিখলেন, সুরও দিলেন, এবং পাড়ায় ঘুরে ঘুরে গেয়েওছিলেন, শুনিয়েছিলেন মানুষকে। গানটি হল—”হিন্দুস্তান মে কেয়া হ্যায় তুমহারা/ ও ব্রিটিশ বেচারা// আভি চলা যাও ইংল্যান্ড /বাজা কর্ ব্যান্ড// মন্দির মসজিদ মে পুজা আরতি সে শুনো আজান/ পুকারতি দিলকো দিলাও মিল হিন্দু মুসলমান // সারি হিন্দুস্তান মে আয়ি হ্যায় তুফান/ গরিবোঁ কো দুখো কি হোগি আসান।”
প্রতিবছর পয়লা বৈশাখের দিন সকালে মন্টু বসুর “বসুশ্রী” সিনেমা হলে তখনকার দিনে কলকাতা, বোম্বের সমস্ত শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করে তাঁদের গান গাইতেন। উত্তমকুমার থাকতেন সেখানে মধ্যমণি এক গায়ক হিসাবে।
গত শতাব্দীর সাতের দশকে কলকাতার রবীন্দ্রসদন মঞ্চে বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সকলের অনুরোধে উত্তমকুমার রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছিলেন। ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সহ অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব।
উত্তমকুমারের অন্তরের অন্যতম দেবতা ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা সারদা, স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু।
১৯৪৪ সাল। তখন পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এক চরম অবস্থায়। নেতাজী দেশের স্বাধীনতার জন্যে বিদেশের মাটিতে তৈরি করেছেন রাসবিহারী বসুর তত্ত্বাবধানে “আজাদ হিন্দ বাহিনী”। নেতাজী রেডিও বার্লিন থেকে দেশের মানুষের কাছে আহ্বান জানালেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে। অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় তখন এক তরতাজা যুবক। আজাদ হিন্দ ফৌজের জন্যে পাড়ায় বাড়ির দরজায় দরজায় ঘুরে ঘুরে বেশ কয়েকজনকে নিয়ে সংগ্রহ করলেন তহবিল। সংগ্রহ হয়েছিল ১৭০০ টাকা। সেই টাকা আজাদ হিন্দ বাহিনীর কাছে পৌঁছাতে তিনি তুলে দিলেন ৩ নম্বর এলগিন রোডে নেতাজীর বাড়িতে গিয়ে নেতাজীর মেজদাদা শরৎচন্দ্র বসুর হাতে। (তথ্য: মহানায়ক উত্তমকুমার / পুরশ্রী / কলকাতা পৌর নিগম)।
টালিগঞ্জ স্টুডিওর লাইটম্যান, স্পটবয়, মেকআপ ম্যান, জুনিয়র টেকনিশিয়ানদের বিপদে-আপদে তাঁদের পাশে দেবদূতের মতো ছিলেন উত্তমকুমার। তাই তিনি তৈরি করেন “শিল্পী সংসদ” নামে একটি সংস্থা।
উত্তমকুমার নীরবে গোপনে সারা বাংলার বহু দুঃস্থ মানুষকে সাহায্য করেছেন বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্নভাবে। শর্ত ছিল একটাই—সেই সাহায্যের কথা, বা কে সাহায্য করছেন, তা কখনো প্রকাশ্যে বলা যাবে না।
১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালের শীতকালে আয়োজন করেছিলেন কলকাতা এবং সারা ভারতের অভিনেতাদের নিয়ে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ। সংগৃহীত অর্থ মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে সেই সময়ের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর হাতে তুলে দেন।
বহুগুণসম্পন্ন এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন উত্তমকুমার। তাই সারা বিশ্বের ইতিহাসে একজন শিল্পী হিসাবে মানুষের অন্তরে প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই অমলিন জনপ্রিয়তা আর বোধহয় কেউ পান নি। গত শতাব্দীর সেই পাঁচের দশক থেকে আজ এই শতাব্দীর এই প্রায় তিনের দশকের প্রাক্কালিক সময় অবধি তিনি তাই বাঙালির ঘরে বাইরে অন্তরে অন্তরে চিরকালের মহানায়ক উত্তমকুমার হিসাবেই অমলিনভাবে বিরাজমান ছিলেন, আছেন, থাকবেন অনন্তকাল।