নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর সময় নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিল, ফর্ম ৬-এর কোনও পরিবর্তনই সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেনি। একই সঙ্গে ওই পরিবর্তন কে করেছিলেন, তা জানতে কমিশনের কাছে নথি চেয়েছে আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজের পদ্ধতি নিয়ে দায়ের হওয়া মামলার শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। মামলাকারীদের তরফে আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী ফর্ম ৬-এ ‘অননুমোদিত’ পরিবর্তনের বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরেন। তার পরেই প্রধান বিচারপতি বলেন, “পরিবর্তিত কোনও ফর্ম ৬-কে আমরা অনুমোদন করিনি।” কমিশনের রিপোর্ট এলে কে এবং কী পরিবর্তন করেছেন, তা দেখতে চান বলেও জানান তিনি।
ফর্ম ৬-এ কী পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক?
নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার জন্য ফর্ম ৬ ব্যবহার করা হয়। এসআইআর চলাকালীন ফর্মটির অনলাইন সংস্করণে নতুন একটি অংশ যুক্ত করা হয়েছিল। সেখানে আবেদনকারীর বাবা-মায়ের নাম আগের এসআইআরের ভোটার তালিকায় ছিল কি না, সেই সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়। অথচ মূল বিধিবদ্ধ ফর্মে সেই পরিবর্তন করা হয়নি বলে মামলায় অভিযোগ ওঠে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং সেটিকে ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, Registration of Electors Rules, 1960 সংশোধন না করে বিধিবদ্ধ ফর্মে এই ধরনের পরিবর্তন করা যায় না।
পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন ওই পরিবর্তিত অংশ সরিয়ে দেয়। ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশন জানিয়েছিল, এসআইআর শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে ১৯৬০ সালের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফর্মই ব্যবহার করা হবে।
কমিশনের আগের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন
২৬ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল, এসআইআর-এর সময় ফর্ম ৬-এর সঙ্গে দেওয়া অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রকে সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছিল। সোমবারের শুনানিতে প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে সেই দাবির ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, পরিবর্তিত ফর্ম ৬-এর অনুমোদন তারা দেয়নি।
এই মামলায় মামলাকারীদের বক্তব্য, কমিশনের সফটওয়্যারে বিধিবদ্ধ ফর্মের পরিবর্তন করা হলে তার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন উঠেছে।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মামলায় নোটিস
এ দিন শুধু ফর্ম ৬ নয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ নিয়েও শুনানি হয়। পটনার বাসিন্দা রাকেশ কুমার সিংহ এবং আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই সদস্যের সম্মতি ছাড়াই একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মামলাগুলিতে জ্ঞানেশ কুমারকে সাময়িক ভাবে দায়িত্ব থেকে সরানোর আবেদনও করা হয়েছিল। তবে সোমবার সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে সাসপেন্ড করার কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি। পরিবর্তে কেন্দ্র, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্টদের নোটিস জারি করে আদালত।
আবেদনকারীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে এসআইআর পরিচালনার পদ্ধতি, ভোটার তালিকা সংশোধন, ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন এবং নির্বাচনী সফটওয়্যারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত। কমিশনের দুই সদস্যের আপত্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও মামলার অংশ হয়েছে।
এসআইআর-এর সময় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন বা বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের আবেদনও করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলি এখনও মামলাকারীদের দাবি হিসেবেই বিচারাধীন; আদালত এ বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
ফর্ম ৬ নিয়ে সোমবারের পর্যবেক্ষণের ফলে এখন মূল নজর থাকবে নির্বাচন কমিশনের কাছে চাওয়া নথির দিকে—কে ফর্মটিতে পরিবর্তন এনেছিলেন এবং সেই পরিবর্তনের আইনি অনুমোদন কী ছিল, তা নিয়ে আদালতে কমিশন কী ব্যাখ্যা দেয়।