বইয়ের স্টলে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে শনিবার কলকাতার রাজপথে অভিনব প্রতিবাদ মিছিল। দুর্গাপুজোর সময় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টলে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ। কোথাও বই ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়া, কোথাও আবার বই পায়ে মাড়িয়ে দেওয়ার ছবি সামনে এসেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদেই শনিবার কলেজ স্ট্রিট থেকে হাতে বই নিয়ে পথে নামলেন সাহিত্যিক, লেখক, অভিনেতা, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের বক্তব্য, বইয়ের উপর আক্রমণ আসলে মানুষের চিন্তাশক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর আঘাত।
শনিবার বিকেলে কলেজ স্কোয়ারে জমায়েতের পর শুরু হয় এই প্রতিবাদী পদযাত্রা। কোনও সাধারণ রাজনৈতিক মিছিলের চেহারা ছিল না এই কর্মসূচির। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল তাঁদের পছন্দের বই। কারও হাতে বইয়ের প্রচ্ছদ, কারও হাতে মনীষীদের ছবি, আবার কারও হাতে প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড। মিছিলে ছিল না কোনও দলীয় পতাকা বা সমবেত রাজনৈতিক স্লোগান।
বই ও সংস্কৃতির মাধ্যমেই প্রতিবাদ
বিশিষ্ট শিল্পী, অধ্যাপক এবং নাগরিক সমাজের একাংশের আহ্বানে এই মিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিলে অংশ নেন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী এবং আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও। বিভিন্ন বয়সের মানুষকে এই পদযাত্রায় পা মেলাতে দেখা যায়।
মিছিল চলাকালীন পরিবেশিত হয় প্রতিবাদী গান, কবিতা পাঠ এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার, প্রাক্তন আমলা ও সাংসদ জহর সরকার, বর্ষীয়ান অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সব্যসাচী চক্রবর্তীর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা এই প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
মিছিলে অংশ নিয়ে সুজন চক্রবর্তী বলেন, সংস্কৃতি ও বইপ্রেমী মানুষেরা একত্রিত হয়ে প্রশংসনীয় ও অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর কথায়, এখানে কোনও বাঁধাধরা স্লোগান বা চিৎকার নেই। কবিতা ও শিল্পের মাধ্যমেই অন্যায়ের জবাব দেওয়া হচ্ছে।
পাড়ায় পাড়ায় ‘বইয়ের হাট’ করার উদ্যোগ
শুধু প্রতিবাদ মিছিলেই থেমে থাকতে চাইছে না বাম নেতৃত্ব। বইয়ের স্টলে হামলার প্রতিবাদে প্রতিটি পাড়ায় ভ্রাম্যমাণ ‘বইয়ের হাট’ এবং বই বিপণি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বইয়ের প্রচার ও পাঠাভ্যাস ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই এই ঘটনার জবাব দিতে চাইছে তারা।
বইয়ের স্টল নিয়ে কী বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী?
বামপন্থীদের বইয়ের স্টলে হামলার অভিযোগ নিয়ে মুখ খুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি বলেছিলেন, তাঁরা বইয়ের বিরোধী নন, বরং বইপ্রেমী। তবে তাঁর বক্তব্যে দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সামনে বইয়ের দোকান বসানো নিয়ে আপত্তির প্রসঙ্গ উঠে আসে। পুষ্পাঞ্জলি, নবমীর আরতি, সিঁদুর খেলা এবং সনাতনী হিন্দু পরম্পরার বিরোধিতা করার পর দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সামনে বইয়ের দোকান বসানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এই মন্তব্য ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে বইয়ের স্টলে হামলার প্রতিবাদে পথে নেমেছেন লেখক, শিল্পী ও বইপ্রেমীরা, অন্যদিকে পুজোর মণ্ডপে বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে রাজনৈতিক তরজা অব্যাহত। তবে কলেজ স্ট্রিটের এই মিছিলের মূল বার্তা একটাই—বই, সংস্কৃতি ও চিন্তার স্বাধীনতার উপর আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না।