কলকাতা: সপ্তমীর সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টির মধ্যে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ঠাকুর দেখতে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ি থেকে পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গিয়েছে।
শনিবার রাতে হাসপাতালে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী। আহতদের চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার তদন্তের আশ্বাস দেন তিনি। চোরবাগান পুজো কমিটির সদস্যদের থানায় ডেকে পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ।
মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা, ১১ জনকে স্থানান্তর
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে খবর, আহতদের ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করে চিকিৎসা চলছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতালের একটি সূত্রের দাবি, মৃতদের মধ্যে তিন জন পুরুষ, এক জন শিশু এবং ১৩ জন মহিলা রয়েছেন।
ঘটনার পর চোরবাগান পুজোমণ্ডপের আলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপের বাহিরপথও বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। উদ্ধারকাজে জোর দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও দমকলের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কাজ শুরু করেন।
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মণ্ডপে ঢোকার চেষ্টা, তারপর হুড়োহুড়ি
সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। এর জেরে রাস্তায় যানজট তৈরি হয়েছিল। সেই সময় চোরবাগান মণ্ডপে ঠাকুর দেখার জন্য বিপুল ভিড় জমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এর ফলে ঠেলাঠেলি ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়। কয়েক জন পড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, মণ্ডপে প্রবেশের পর একটি বৃত্তাকার ‘এলিভেটেড করিডোর’ রয়েছে। ওই পথ দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে মণ্ডপ থেকে বেরোতে হয় দর্শনার্থীদের। সেই করিডোরেই বিপত্তি ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ঠিক কী কারণে এই দুর্ঘটনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
উদ্ধারকারীদের দাবি, আহতদের মধ্যে কয়েক জনকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, সময়মতো পুলিশ বা নিরাপত্তারক্ষীদের দেখা মেলেনি এবং সাহায্য চেয়েও তাঁরা সাড়া পাননি। তবে এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
তদন্তের আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রীর
পুজো উদ্যোক্তা বিকাশ দাস জানিয়েছেন, কীভাবে এই ঘটনা ঘটল, তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না। আপাতত আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের অগ্রাধিকার। তাঁর কথায়, ভিড়ের চাপে পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঘটনার অনুসন্ধান করা হবে এবং কারা দায়িত্বে ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হবে। মণ্ডপের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। মৃতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার।
পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে একটি টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। নম্বর ১৮০০৩৪৫৫৬৭৮।
‘অরব’ ভাবনায় তৈরি হয়েছিল মণ্ডপ
চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির ২০২৬ সালের থিম ছিল ‘অরব’, যার ইংরেজি তর্জমা ‘বিয়ন্ড সাউন্ড’। শব্দের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে নীরবতার গভীরে পৌঁছনোর ভাবনা তুলে ধরেছিল এই পুজোর আয়োজন। সেরার সেরা পুজোর তালিকায় এই পুজো তৃতীয় স্থানে ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মণ্ডপটি ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে দেখার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, সেই বৃত্তাকার চলাচলের পথেই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করতে হবে।
এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দেবদীপ অধিকারী। জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা পুজো কমিটির চেয়ারম্যান এবং উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষও এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গিয়েছে।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় উৎসবের আনন্দ মুহূর্তে শোকের আবহে বদলে যায়। এখন দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, আহতদের চিকিৎসা এবং মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।