এ বার মনসা পুজোতেও অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সোমবার এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মনসা পুজোর দিন বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া জেলার সরকারি অফিস এবং স্কুলগুলিতে দুপুর ২টোর পর আর কোনও কাজ হবে না। অর্থাৎ ওই দিন ওই দুই জেলায় অর্ধদিবস ছুটি থাকবে।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, এই প্রথম মনসা পুজো উপলক্ষে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় সরকারি ভাবে অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করা হল।
কবে মনসা পুজো?
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে নাগপঞ্চমী পালিত হয়। এ বছর ১৬ আগস্ট বিকেল ৪টা ৫২ মিনিটে পঞ্চমী তিথি শুরু হয়েছে এবং ১৭ আগস্ট বিকেল ৫টা পর্যন্ত তা থাকবে। উদয়া তিথির নিয়ম অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট পালিত হচ্ছে নাগপঞ্চমী। বহু জায়গায় এই দিনেই দেবী মনসার পুজো হয়। পুজোর শুভ সময় ভোর ৬টা ৮ মিনিট থেকে সকাল ৮টা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত। তবে কিছু এলাকায় মঙ্গলবারও মনসা পুজো হবে।
কেন পুজো করা হয় দেবী মনসার?
পুরাণে দেবী মনসাকে মূলত সর্পদংশন থেকে রক্ষাকারী দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কথিত আছে, সর্পদংশনের ভয় থেকে মানুষকে রক্ষা করতে প্রজাপতি ব্রহ্মা কশ্যপমুনিকে একটি মন্ত্র আবিষ্কারের নির্দেশ দেন। সেই বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার সময় তাঁর ‘মননক্রিয়া’ থেকে স্বর্ণবর্ণের এক দেবীর আবির্ভাব হয়। মন থেকে জন্ম বলেই তাঁর নাম হয় ‘মনসা’।
তবে দেবী মনসাকে ঘিরে রয়েছে একাধিক পুরাণকথা ও লোককাহিনি। কোথাও তাঁকে শিবের মানসকন্যা, আবার কোথাও ঋষি কশ্যপের কন্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জরৎকারুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ এবং তাঁদের সন্তান আস্তিকমুনিকে নিয়েও পুরাণে নানা কাহিনি রয়েছে।
মনসামঙ্গলে চাঁদ সওদাগর-বেহুলার কাহিনি
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে দেবী মনসার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে রয়েছে মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনি। সেখানে চাঁদ সওদাগরের কাছ থেকে পুজো পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় দেবী মনসার নানা কর্মকাণ্ডের বর্ণনা রয়েছে। চাঁদ সওদাগরের পুত্র লখিন্দরকে সর্পাঘাতে মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়। পরে বেহুলার অদম্য লড়াই ও কৃতিত্বে লখিন্দরের প্রাণ ফিরে আসে।
এই কাহিনির মধ্য দিয়েই বাংলার মানুষের কাছে দেবী মনসার পুজো ও মাহাত্ম্য আরও ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন লোককথায় কখনও তাঁকে প্রতিহিংসাপরায়ণ দেবী, আবার কখনও নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করা এক শক্তিশালী নারী চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। চাঁদ সওদাগরের কাছ থেকে পুজো পাওয়ার জন্য তাঁর দীর্ঘ লড়াইও বাংলার লোকসাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এ বার সেই মনসা পুজোকে কেন্দ্র করেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্ধদিবস ছুটির সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে, বিশেষ করে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার মতো জেলাগুলিতে যেখানে এই পুজোর সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকাচারের গভীর যোগ রয়েছে।