কলকাতা: ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসকে সামনে রেখে রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হতে শুরু করেছে। রবিবার দুপুরে ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে হাজির হয়ে সম্ভাব্য মঞ্চ ও শহিদ বেদীর অবস্থান নির্ধারণের জন্য মাপজোক শুরু করল কালীঘাটপন্থী তৃণমূল নেতৃত্ব। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আনুষ্ঠানিক অনুমতি মেলার আগেই এই তৎপরতা ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল বলেই মনে করা হচ্ছে।
রবিবারের এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন, বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ, দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতি বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়, মৃত্যুঞ্জয় পাল, শক্তিপ্রতাপ সিংহ-সহ দলের একাধিক নেতা। ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা বিগত বছরগুলিতে যেখানে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল, সেই স্থান পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি সম্ভাব্য মঞ্চের উচ্চতা, দৈর্ঘ্য এবং শহিদ বেদীর অবস্থান নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা ও পরিমাপের কাজও করেন।
দলের নেতাদের দাবি, আপাতত প্রাথমিক পর্যায়ের পরিমাপের কাজ শেষ হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে ডেকোরেটর ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে আলোচনা করে মঞ্চের চূড়ান্ত নকশা তৈরি করা হবে। প্রত্যাশিত জনসমাগম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার বিভিন্ন দিক মাথায় রেখেই চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
রবিবারের কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘স্থান মাহাত্ম্য’ নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বের অবস্থান। কেন প্রতি বছর একই জায়গায় শহিদ দিবস পালন করা হয়, সেই প্রসঙ্গে কুণাল ঘোষ বলেন, “১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ঘটনাবলির সঙ্গে এই স্থান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই কারণেই তৎকালীন যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, শহিদদের স্মরণে প্রতি বছর এই স্থানেই কর্মসূচি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই জায়গাটির সঙ্গে আমাদের কর্মীদের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। এখানে কর্মীদের রক্ত, ঘাম এবং সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। তাই এই স্থান থেকে কর্মসূচি সরানোর কোনও প্রশ্নই ওঠে না। এখানেই অনুষ্ঠান হবে। অন্য কেউ কোথায় কী কর্মসূচি করবে, তা তাদের বিষয়।”
একই সুরে রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন বলেন, “১৯৯৩ সালের ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি ঘোষণা করেছিলেন, শহিদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর এই স্থানেই মূল কর্মসূচি পালন করা হবে। সেই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছে তৃণমূল।”
তবে এ বার রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তৃণমূলের ভিত নড়ে গিয়েছে। দলের একাংশের সাংসদ ও বিধায়ক পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের ‘প্রকৃত তৃণমূল’ বলে দাবি করছেন। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরও পৃথকভাবে ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি পালনের ঘোষণা করেছে।
শনিবার ওই গোষ্ঠীর নেতা আখরুজ্জমান দাবি করেন, অতীতে শহিদ দিবসের মূল কর্মসূচিতে শহিদদের গুরুত্ব আড়ালে চলে গিয়েছিল। তাঁদের দাবি, এ বার তাঁরা ‘প্রকৃত শহিদদের’ সম্মান জানাতে পৃথক সমাবেশ করবেন। সূত্রের খবর, তাঁরাও ভিক্টোরিয়া হাউস সংলগ্ন এলাকাতেই সভা করার পরিকল্পনা করছেন।
এই পরিস্থিতিতে দলের নাম ও প্রতীক ব্যবহার করে কর্মীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তুলে দুই থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল। সাংসদ দোলা সেন কালীঘাট ও নিউটাউন থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, শেষ পর্যন্ত ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভার অনুমতি কলকাতা পুলিশ কাকে দেবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অনুমতির আগেই ধর্মতলায় মাপজোকের এই উদ্যোগ প্রতিপক্ষ শিবিরের উপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হতে পারে। তবে এ কথা স্পষ্ট, ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ ঘিরে রাজনৈতিক লড়াইয়ের আবহ এখন থেকেই তৈরি হতে শুরু করেছে।