প্রথম পাতা প্রবন্ধ বিশ্বকাপ এলে বিশ্ব কাঁপে: ফুটবলের মহারণে আবেগ, ইতিহাস ও উন্মাদনার এক অনন্য কাহিনি

বিশ্বকাপ এলে বিশ্ব কাঁপে: ফুটবলের মহারণে আবেগ, ইতিহাস ও উন্মাদনার এক অনন্য কাহিনি

13 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

প্রতি চার বছর অন্তর সারা বিশ্ব যেন এক সংক্রামক আবেগে, উচ্ছ্বাসে এবং উদ্দীপনার আতিশয্যে ভেসে যায়। তার নাম ফুটবলের বিশ্বকাপ (FIFA World Cup Football)।

অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজ্যে, পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায়, এমনকি একই পরিবারের মধ্যেও বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী প্রিয় ফুটবল দলের সমর্থক হয়ে যান ফুটবলপ্রেমীরা। কেউ ব্রাজিলের, কেউ আর্জেন্টিনার, কেউ ফ্রান্সের, কেউ ইংল্যান্ডের, কেউ পর্তুগালের সমর্থক। যদিও আমরা, অর্থাৎ আমাদের ভারতবর্ষ, আজ পর্যন্ত কখনও বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী হিসেবে জায়গা করে নিতে পারিনি, তবুও সেই না-পারার কষ্টটাকে লুকিয়ে বোধহয় রাত জাগে ভারতবর্ষের মানচিত্রে থাকা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইতালি, জার্মানি-সহ বিভিন্ন দেশের সমর্থক হয়ে।

সারা পৃথিবীকে এক বিনি সুতোর মালায় গেঁথে দেয় এই বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা।

ফুটবলের বিশ্বকাপ প্রথম শুরু হয় ১৯৩০ সালে দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়েতে। সেই বছর মোট ১৩টি দেশ এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল। ফাইনালে উরুগুয়ে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি ফুটবল দল। ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উরুগুয়ে। ১৯৫৪ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি।

এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিযোগিতার আসর ২৩তম। শুরু হয়েছে ১১ জুন, ২০২৬ এবং শেষ হবে ১৯ জুলাই, ২০২৬। এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ তিনটি— মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা।

স্বর্ণখচিত বিশ্বকাপ ফুটবল ট্রফিটি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। ট্রফিটির উচ্চতা ৩৭ সেন্টিমিটার এবং ব্যাস ১৩ সেন্টিমিটার। বিশ্বকাপ ট্রফির ওজন ৬ কেজি ১৭৫ গ্রাম। ট্রফিটি তৈরি করা হয়েছে ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে। ট্রফির ভেতরের অংশ ফাঁপা এবং নীচের অংশে রয়েছে ম্যালাকাইটের তৈরি দুটি বৃত্ত। ট্রফির উপরিভাগে দেখা যায় দুই মানবমূর্তির মাথার উপর পৃথিবীর প্রতীক। এই ট্রফিটির নকশা করেছিলেন ইতালির ভাস্কর সিলভিও গাজানিগা (২৩ জানুয়ারি, ১৯২১ – ৩১ অক্টোবর, ২০১৬)। ১৯৭১ সালে তিনিই বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন।

ব্রাজিল এই বিশ্বকাপ জিতেছে মোট পাঁচ বার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে)। ১৯৭০ সালে ফুটবলের সম্রাট পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিল তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে জুলে রিমে ট্রফি স্থায়ীভাবে নিজেদের দেশে নিয়ে যায়। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফির নাম ছিল “জুলে রিমে কাপ”। ১৯৭৪ সাল থেকে বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি ব্যবহার শুরু হয়।

জার্মানি এই কাপ জিতেছে চারবার (১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ এবং ২০১৪ সালে)। ইতালি জিতেছে চারবার (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ এবং ২০০৬ সালে)। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তিনবার (১৯৭৮, দিয়েগো মারাদোনার নেতৃত্বে ১৯৮৬ এবং লিওনেল মেসির নেতৃত্বে ২০২২ সালে)। ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতেছে দু’বার (১৯৯৮ এবং ২০১৮ সালে)। ইংল্যান্ড জিতেছে একবার, ১৯৬৬ সালে। স্পেন বিশ্বকাপ জিতেছে ২০১০ সালে, ইকের কাসিয়াসের নেতৃত্বে।

ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ছিল ব্রাজিলের পেলের বিশ্বকাপ। তেমনি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ছিল আর্জেন্টিনার মারাদোনার বিশ্বকাপ এবং ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ছিল ইতালির পাওলো রোসির বিশ্বকাপ। ২০২২ সালের বিশ্বকাপকে বলা হয় আর্জেন্টিনার মেসির বিশ্বকাপ।

এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্বকাপে বিভিন্ন দেশের ফুটবলাররা তাঁদের একক দক্ষতার বিস্ময়কর পরিচয় দিয়েছেন। যেমন— পর্তুগালের ইউসেবিও ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, ব্রাজিলের ডিডি, ভাবা, গারিঞ্চা, রোনাল্ডো, রোমারিও, সক্রেটিস, বেবেতো, কাকা, জুনিয়র, রোনালদিনহো, রবার্তো কার্লোস, জাগালো, জিকো, নেইমার প্রমুখ। উরুগুয়ের এনজো ফ্রান্সেসকোলি, ইতালির রবার্তো বাজ্জিও, ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনি, জিনেদিন জিদান, জুস্ত ফঁতেন, রাশিয়ার লেভ ইয়াসিন, কলম্বিয়ার কার্লোস ভালদেররামা, জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজে, বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, অলিভার কান, মানুয়েল নইয়ার, লোথার ম্যাথাউস, গের্ড মুলার, ফিলিপ লাম, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন, জর্ডান পিকফোর্ড, ডেকলান রাইস, ক্যামেরুনের রজার মিল্লা— বিশ্বকাপের ইতিহাসে এঁদের অবদান চিরস্মরণীয়।

প্রত্যেক বারের মতো এবারেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মতো আমাদের দেশেও ফুটবল উন্মাদনা তুঙ্গে। তবে খেলাগুলি দিনের বেলায় হলেও, ভৌগোলিক কারণে আমরা সেগুলি দেখতে পাই গভীর রাত কিংবা শেষরাতের দিকে। ফলে ফুটবলপ্রেমীরা রাত জাগবেনই তাঁদের প্রিয় দলের খেলা দেখার জন্য। পাড়ায়-পাড়ায় মাঝরাতে উঠবে “গোওওওওল” বলে উল্লসিত হয়ে ওঠার সমবেত কণ্ঠস্বরের উত্তাপ।

এক কথায় বলা যায়, বিশ্বকাপ ফুটবল বেঁচে থাকার এক অনন্যসাধারণ আনন্দের, খুশির এবং মহামিলনের পথে নিয়ে যায় সমস্যাকুল এই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষকে। সেটার মূল্যই বা কম কিসে?

সেই গানটার কথা মনে পড়ে—

“সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল,
কি মধু আছে যে তোমার নামেতে বাবা ফুটবল…”

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.