কলকাতা: কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের ‘ফ্রিজ়’ হয়ে থাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি আপাতত খুলছে না। দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার শুনানিতে বৃহস্পতিবার কলকাতা হাই কোর্ট সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছে হলফনামা তলব করেছে। একই সঙ্গে, তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে পুলিশকেও রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য।
আদালত সূত্রে খবর, আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে নিজেদের বক্তব্য হলফনামা আকারে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি পুলিশকেও তদন্তের বর্তমান অবস্থান জানাতে বলা হয়েছে। আগামী বুধবার মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূলের সংসদীয় ও পরিষদীয় দলে ভাঙনের অভিযোগ তুলে দলের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ করার আবেদন জানিয়েছিলেন। যদিও ব্যাঙ্ককে পাঠানো চিঠিতে তিনি নিজেকে দলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেই উল্লেখ করেছিলেন।
এর পর গত ১৮ জুন বিধাননগর সাইবার থানায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক বিধায়ক অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, একটি বড় সাইবার প্রতারণার অর্থ কয়েকটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে, যার মধ্যে তৃণমূলের কিছু অ্যাকাউন্টও থাকতে পারে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এফআইআর দায়ের করে এবং পরদিন সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলিকে তিনটি অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা বা ডেবিট লেনদেন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় কালীঘাটপন্থী তৃণমূল। দলের দাবি, ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকেই কর্মীদের বেতন, অফিস পরিচালনা, বিদ্যুতের বিল এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির খরচ মেটানো হয়। শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ করা হয়েছে বলে আদালতে দাবি করে তারা। বৃহস্পতিবারের শুনানিতে কালীঘাটপন্থী শিবিরের দাবি, তিনটি নয়, মোট আটটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ করা হয়েছে।
কালীঘাট তৃণমূলের আইনজীবী কিশোর দত্ত আদালতে বলেন, অভিযোগে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি কত টাকা, কার কাছ থেকে এবং কী কারণে অ্যাকাউন্টে এসেছে। অভিযোগকারী নিজেও টাকার উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত নন। সে ক্ষেত্রে তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই পুরো অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ করা হয়েছে বলে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর যুক্তি, কোনও নির্দিষ্ট অঙ্ক নিয়ে সন্দেহ থাকলে শুধুমাত্র সেই পরিমাণ অর্থ আটকে রাখা যেত।
অন্যদিকে, কালীঘাটপন্থী শিবিরের আর এক আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি প্রশ্ন তোলেন, কোনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে পুলিশ এ ধরনের পদক্ষেপ করতে পারে কি না। তাঁর দাবি, একটি রাজনৈতিক দলকে কার্যত পঙ্গু করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি নির্বাচন কমিশন বা আদালত সিদ্ধান্ত নেবে, পুলিশের নয়।
অভিযোগকারী বিধায়কের আইনজীবী নীরজ কিশন কৌল অবশ্য আদালতে দাবি করেন, তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ২০২৫ সালেই শেষ হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দল যদি বিভক্ত হয়ে থাকে, তবে তহবিলের উপর কার অধিকার রয়েছে, তা স্থির হওয়ার আগেই কী ভাবে এক পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে।
মামলার শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি আদালতে বলেন, দলের নেতৃত্ব নিয়ে যখন দু’পক্ষের দাবি রয়েছে, তখন আদালতের এমন নির্দেশ দেওয়া উচিত যা বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব।
এই পরিস্থিতিতে আদালত আপাতত কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ না দিয়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের বক্তব্য জানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।