বাংলার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণে এবার লড়াই সরাসরি ‘গেরুয়া বনাম লাল’—এমনটাই মনে করছে সিপিএম। তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনের অবসান এবং রাজ্যে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধির পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের সংগঠন ও জনভিত্তি পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে বঙ্গ সিপিএম। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, জীবন-জীবিকা এবং জনস্বার্থের ইস্যুকে সামনে রেখে আন্দোলন গড়ে তোলাই আগামী দিনের অন্যতম প্রধান কৌশল হতে চলেছে।
শনিবার থেকে কল্যাণীতে শুরু হয়েছে সিপিএমের বর্ধিত রাজ্য কমিটির বিশেষ অধিবেশন। গত এক দশকে দলের সাংগঠনিক সাফল্য, ব্যর্থতা এবং দুর্বলতার পর্যালোচনার পাশাপাশি বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়েও সেখানে আলোচনা হচ্ছে।
সিপিএম নেতৃত্বের মতে, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়ার রাজনীতি করেছে। সেই বিতর্কে আটকে না থেকে মানুষের বাস্তব সমস্যাকে সামনে রেখে জনসংযোগ বাড়াতে হবে। রাজ্যজুড়ে আন্দোলনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগকেই দলের প্রধান হাতিয়ার করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ‘আজাদি’ স্লোগান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও লাগাম টানার কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রের খবর।
সিপিএমের অভিযোগ, বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন তৈরি করছে। পাশাপাশি গরিব ও সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী নীতি গ্রহণের অভিযোগও তুলেছে তারা। মুক্ত চিন্তার পরিসর সংকুচিত করা এবং বাঙালি সংস্কৃতির উপর আক্রমণের অভিযোগ তুলে রাজ্য সরকারও কার্যত সংঘ পরিবারের নির্দেশ মেনে চলছে বলে দাবি করেছে বাম দলটি।
তবে বিজেপির উত্থানের জন্য তৃণমূলকেও দায়ী করছে সিপিএমের জেলা নেতৃত্ব। তাদের ব্যাখ্যা, তৃণমূলের দুর্নীতি এবং স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের একটা বড় অংশ বিজেপির দিকে গিয়েছিল। কিন্তু বিজেপিও একই ধরনের স্বৈরাচারী রাজনীতির পথে এগোচ্ছে—এমনই দাবি সিপিএমের। তাই মানুষের কাছে গিয়ে বিজেপির ‘মুখোশ’ খুলে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মেরুকরণের রাজনীতির অবসানের কিছুটা সুফল ইতিমধ্যেই মিলতে শুরু করেছে বলেও দাবি জেলা নেতৃত্বের। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় দলের জনসমর্থন বাড়ছে বলে তাদের দাবি। যদিও একইসঙ্গে সিপিএমের অভিযোগ, আরএসএস প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে রাজনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখার কৌশল নিচ্ছে। সংঘের এই কৌশলের মোকাবিলা কীভাবে করা যায়, তা নিয়েও অধিবেশনে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
প্রায় এক দশক পর বাংলায় সিপিএমের সাংগঠনিক পর্যালোচনার এই বড় পরিসরের উদ্যোগে আত্মসমালোচনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত দশ বছরে কোথায় সাফল্য এসেছে, কোথায় ব্যর্থতা এবং কোথায় সাংগঠনিক ঘাটতি রয়ে গিয়েছে—সবকিছু চিহ্নিত করেই আগামী দিনের পথ নির্ধারণ করতে চাইছে দল।
কল্যাণীর অধিবেশনে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, “গত দশ বছরে পার্টির কোথায় সাফল্য, কোথায় ব্যর্থতা, কোথায় ঘাটতি—সবকিছু চিহ্নিত করেই আগামী দিনের কৌশল তৈরি করতে হবে।” বাধা এলেও তা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার বার্তাও দেন তিনি।
বাংলায় দলের পুনরুজ্জীবনকে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত করেছেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি। তাঁর বক্তব্য, বাংলায় সিপিএম পুনরায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারলে গোটা দেশে দলের রাজনৈতিক দুর্দিন কাটানো কঠিন। একইসঙ্গে বিজেপি ও আরএসএসের মোকাবিলায় বিরোধী দলগুলির বৃহত্তর ঐক্যের উপর জোর দিয়েছেন তিনি। ইন্ডিয়া জোটকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্য ও জনআন্দোলনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন বেবি।
ফলে কল্যাণীর অধিবেশনে বঙ্গ সিপিএমের সামনে মূলত দুটি লক্ষ্য—একদিকে গত এক দশকের সাংগঠনিক দুর্বলতার হিসেবনিকেশ, অন্যদিকে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে জনভিত্তি তৈরি। তৃণমূল-বিরোধী ক্ষোভের হাত ধরে বিজেপির উত্থানের পর এবার বিজেপি-বিরোধী ক্ষোভকে নিজেদের সংগঠনের পক্ষে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করাই বঙ্গ সিপিএমের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।