বিপর্যয়ের দু’দিন পরেও উত্তর নেপালের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। ভোটেকোশী নদীর দুই পাড়জুড়ে এখনও ধ্বংসের চিহ্ন। নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গতদের উদ্ধারে জোরকদমে কাজ চালাচ্ছে নেপালের পুলিশ ও সেনাবাহিনী। প্রশাসনের তরফে প্রায় ১৪ হাজার সদস্যের যৌথ বাহিনী উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে নামানো হয়েছে।
নেপাল পুলিশের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৭টা পর্যন্ত দেশে ৪৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক। হড়পা বানের অভিঘাত শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সীমান্তের ওপারে চিনের তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুই দেশ মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত ১,৪৭০ জনের কোনও খোঁজ মেলেনি বলে জানা গিয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে নেপাল ও চিনের নাগরিক ছাড়াও বিভিন্ন দেশের ৫১৭ জন নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৯০ জন ভারতীয়। এখনও তাঁদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গিয়েছে।
এরই মধ্যে নতুন করে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে নেপালে। ফের হড়পা বান নামতে পারে বলে পড়শি দেশটিকে সতর্ক করেছে চিন। হিমবাহধসের পর পাহাড়ি নদীগুলির খাতে বিপুল পরিমাণ তুষার, পাথর ও কাদামাটি জমে গিয়েছে। কোথাও কোথাও সেই জমাট পদার্থ নদীর স্বাভাবিক গতিপথ আটকে অস্থায়ী বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে চিনের তরফে জানানো হয়েছে।
চিনের আশঙ্কা, নদীর জলের চাপ বাড়তে থাকলে এই অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ফের বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও তুষার নদীপথ ধরে নীচের দিকে নেমে এসে নতুন করে বিপর্যয় ঘটাতে পারে। বুধবার সকালে ভোটেকোশী নদীতে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, ফের তেমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নেপাল প্রশাসনও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে।
বৃহস্পতিবার রাতে চিনের জলসম্পদ দফতরও এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করে। তাদের দাবি, পাথর, কাদা এবং তুষার জমে তিব্বতের ছোকেন খোলা ও পুরেপি সাংপো নদীর সংযোগস্থলে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়েছে। এই দুই নদী তিব্বত থেকে নেপালের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। কৃত্রিম হ্রদ ভেঙে গেলে ফের বড় বিপর্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা চিনের।
এদিকে উদ্ধারকাজও চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। এখনও পর্যন্ত দুর্গত এলাকা থেকে হেলিকপ্টারে ১,১৯৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে নেপাল পুলিশের ৭,২৫০ জন, সেনাবাহিনীর ৪,২০০ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১,৮৪৫ জন সদস্যকে নামানো হয়েছে।
দুর্গত জেলাগুলির জন্য আর্থিক সাহায্যেরও ঘোষণা করেছে কাঠমান্ডু। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার জন্য ১ কোটি নেপালি টাকা করে এবং পার্শ্ববর্তী ধাদিং জেলার জন্য ৫০ লক্ষ নেপালি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
নেপালের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পাশে দাঁড়িয়েছে ভারতও। ইতিমধ্যেই নেপালে ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে নয়াদিল্লি। আন্তর্জাতিক স্তরেও সাহায্যের আশ্বাস এসেছে। নেপালের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নেপালের বিপর্যয় নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘‘এটা ভয়াবহ। আমরা নেপালের সঙ্গে কথা বলেছি। যে কোনও প্রয়োজনে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা ত্রাণ পাঠাচ্ছি।’’ নেপালের নেতৃত্বকে প্রয়োজনীয় সাহায্যের কথা জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই বার্তা সমাজমাধ্যমে তুলে ধরে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিয়ো গোর জানান, এই কঠিন সময়ে নেপালকে সাহায্য করতে আমেরিকা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তবে উদ্ধার অভিযান চললেও বিপদ এখনও কাটেনি। এক দিকে নিখোঁজদের সন্ধান, অন্য দিকে নতুন করে হড়পা বানের আশঙ্কা—দুইয়ের মধ্যে চরম উদ্বেগে নেপালের নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ। প্রশাসনের নজর এখন পাহাড়ি নদীগুলির জলস্তর এবং কৃত্রিম হ্রদগুলির পরিস্থিতির দিকে।