প্রথম পাতা প্রবন্ধ ভাষা সহস্র ধারায় বয়, ভাষাকে ভালোবাসতে হয়! কিছু অজানা কথা

ভাষা সহস্র ধারায় বয়, ভাষাকে ভালোবাসতে হয়! কিছু অজানা কথা

127 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

আমাদের বাংলায় একটি প্রবচন বহুজনশ্রুত এবং বহুজনজ্ঞাত,সেটা হলো “কথা ষোল ধারায় বয়,কথা কইতে জানতে হয়”। এখন এই কথার মূল ভিত্তিই তো হলো ভাষা।সে আমাদের মাতৃভাষাই হোক আর অন্যান্য ভাষাই হোক।কারন,যে ভাষা আমার কাছে অন্য ভাষা,সেই ভাষাও অপর কারো না কারোর কাছে তার মাতৃভাষা অবশ্যই।তাই আমাদের মানব সভ্যতার সংস্কৃতি হওয়া উচিৎ সকল ভাষাকেই যথাযথ সম্মান দেওয়া।সেখানে কোনও রকমের সংকীর্ণতার অপর নাম কূপমন্ডুকতা,হীনমন্যতা। যা অবশ্যই আমাদের পরিহার করাই উচিত।

আর ঠিক ২ বছর পরে আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিন যা ২১ শে ফেব্রুয়ারী হিসাবে সমাদৃত, তার ৭৫ বছরের হীরকজয়ন্তী পালিত হবে।যে ইতিহাস ঘটেছিল ৮ ই ফাল্গুন, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ//২১ শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ//বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (এখন বাংলাদেশ) প্রাঙ্গনে। যার আর একটি ইতিহাস হয়েছিল ১৯৬১ সালের ১৯ শে এপ্রিল ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায়।

যে ভাষা ও তাকে ঘিরে আন্দোলনের সূত্রে সারাবিশ্ব পেল তার আপন আপন মাতৃভাষাকে সারাবছর চর্চার পাশাপাশি এক বিশেষ দিনের মোড়কে উদযাপনের ঐতিহাসিক অবকাশ,সেই আমাদের বাংলা ভাষা কেমন আছে এই ২০২৪ -এ? আজকের বাঙালির কাছে কী তার মর্যাদা? তাকে ঘিরে প্রত্যাশাই বা কতটুকু, করনীয় কি কি,তার ইতিহাস অনুশীলনই বা কতটা করা হয়,বা হচ্ছে। সেইসব ভাবনা বা প্রসঙ্গ সামনে রেখেই আমাদের ভাষাকে ভালোবাসেন যারা,যারা গৌরব অনুভব করেন মাতৃভাষার ঐতিহ্য,পরম্পরায়,সেইসব মানুষরাই অনেকেই নীরবে কাজ করে যান। তাদের সেই কাজই আমাদের এই মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্যকে আরও সম্মৃদ্ধ করে,সম্মানিত করে।

আমাদের এই বাংলা ভাষার অতীত ইতিহাসের ইতিবৃত্ত আজও অনেক অজানা।যেমন,আমাদের এই বাংলার বুকে, বিশেষ করে কলকাতা নগরের পত্তনের(১৬৯০ সাল) প্রায় পরপরই সেই যুগের সংস্কৃত ভাষা,বাংলা ভাষা,আরবি ভাষা,ফারসি ভাষা,হিন্দুস্তানী ভাষা,চর্চার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তখনকার শাসকদের। তারও আগে এদেশে,এই বাংলায় মোগল শাসনকালে এই আরবি,ফারসী,উর্দু, ইত্যাদি ভাষাগুলি সরকারি কাজ করার জন্য প্রচলিত ছিল,ফলে তার চর্চাও ছিল।

সেই প্রেক্ষিতেই তখনকার সদ্য স্থাপিত কলকাতার বুকে তার আশেপাশে সংস্কৃত এবং বাংলা ভাষার অনেক পণ্ডিতদের টোল ছিল। ছিল আরবি ফারসি শেখার স্থান।১৭০২ সালে বেশকিছু এইরকম টোলের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৭৮০ সালে আমরা পাই হিকি সাহেবের বাংলা গ্রামার এবং গেজেট।১৭৮১ সালে কলকাতায় তৈরী হয়েছিল কলকাতা মাদ্রাসা। ১৭৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এশিয়াটিক সোসাইটি। ১৮০০ সালের ৯ ই জুলাই (মতান্তরে ১০ ই জুলাই) প্রাচ্য ভাষা ও সংস্কৃতি অধ্যয়নের জন্য তৎকালীন লর্ড ওয়েলেসলি সাহেব মিস্টার উইলিয়াম কেরীর তত্ত্বাবধানে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তৈরী করেন। সেখানে সংস্কৃত এবং বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য ছিলেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর,মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার,রামমোহন বাচস্পতি,রামরাম বসু, তারিনীচরিন মিত্র,উইলিয়াম কেরী,প্রমুখ পন্ডিতগন।ফারসি ভাষার জন্য ছিলেন আহম্মদ আলি মির্জা,এডমন্ডস্টোন সাহেব,জন এইচ.হ্যারিংটিন প্রমুখ। আরবি ভাষার জন্য ছিলেন জন বেইলি, শামসেরউদ্দিন বেগ,প্রমুখ। হিন্দুস্তানী ভাষার জন্য ছিলেন জন বোর্থ উইক গিলক্রিস্ট, লাল্লুলাল ওঝা প্রমুখ।তার আগে তৈরী হয়েছিল শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন। সেখানে ছিলেন বাংলা, সংস্কৃত ভাষার জন্য উইলিয়াম কেরী,মারশম্যান।
১৮১৭ সালের ১৭ই জানুয়ারী, সোমবার, ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে এবং রাজা রামমোহন রায়, রাজা রাধাকান্ত দেব,বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, রসময় সুর,মতিলাল শীল,দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রমুখদের সহযোগিতায় চিৎপুরের একটি বাড়িতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল হিন্দু কলেজ।যা ১৮৫৫ সালে এখনকার জায়গাতে কলেজস্ট্রীটে স্থানান্তরিত হয়,এবং তখন তার নাম হয়েছিল প্রেসিডেন্সী কলেজ।যেখানে বাংলা তথা ভারতবর্ষের নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল লুই হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও, রিচার্ডসন, প্রমুখ মুক্তমনা মানুষদের পরিচালনায়।অনুপ্রানিত হয়েছিলেন এই বাংলার বেশ কয়েকজন মনীষাসম্পন্ন মানুষ।যাদের বলা হতো “ইয়ং বেঙ্গল”। ১৮১৮ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হয়েছিল গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য সম্পাদিত বাংলা সংবাদপত্র, সেই একই সময়ে শ্রীরামপুর মিশন থেকে ১৮১৮ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়েছিল মারশম্যানের বাংলা কাগজ।

১৮২৪ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল সংস্কৃত কলেজের। উনিশ শতকের কলকাতায় প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার লক্ষ্যে তৈরী হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিসীম। পাশাপাশি, বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কারের অন্যতম কেন্দ্র এই কলেজ(এখন বিশ্ববিদ্যালয়)। বাংলা ভাষা সহ প্রাচ্যবিদ্যা ও ভাষার পাশাপাশি আধুনিক সাহিত্য, ভাষা,দর্শন শিক্ষার অন্যতম পীঠস্থান সংস্কৃত কলেজ। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার,তারানাথ তর্কবাচস্পতি,মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্নের মতো সংস্কৃত ও বাংলা পন্ডিতদের পাশাপাশি পালি ভাষায় জাতকের প্রখ্যাত অনুবাদক ই.বি.কাওয়েল,ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস-লেখক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কর্তা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী,আধুনিক ভারতের তথা এশিয়ার প্রথম শব-ব্যবচ্ছেদক মধুসূদন গুপ্ত,প্রমুখরা ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত।

যাইহোক,এদেশে এসে বিশেষ করে কলকাতা পত্তনের সাথে সাথে এদেশে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সেই সময়ের ব্রিটিশ শাসকরা এই নতুন দেশে এসে এদেশের ভাষা বুঝতে পারার জন্যই তারা সমাধানের পথ খুঁজে হাজির করলেন মুনশি নামক এক সম্প্রদায়ের। এই মুনশিই এদেশীয় ভাষা শেখাবেন সাহেবদের। মুনশি আরবি,ফারসি, ইংরাজি,বাংলা ভাষা জানেন। কথা বলে সাহেব সন্তুষ্ট। তাই মুনশি বহাল হল সাহেবের কাছে। বহাল করে সাহেব বলল মুনশিকে–” তুমি আমার মুনশি হইয়া আমার কাছে চাকরি করিবে,আমাকে ভাষা শিখাইবে, আমাকে শিখ্সা করাইবে।”

উনিশ শতকের প্রথম দিকে এভাবেই সাহেবদের “বাঙ্গালি কথা ও কার্য কর্মের লেখা পড়া” শেখার শুভারম্ভ হয়েছিল।একথা জানা যায় উইলিয়াম কেরী সাহেবের “কথপোকথন” থেকে। আর মুনশি রেখে ভাষা শেখার ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় কলকাতায় ১৮০০ সালে ফোর্ উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হওয়ায়। সেখানে বাংলা শেখানোর দায়িত্ব পান উইলিয়াম কেরী সহ মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার,রামনাথ বাচস্পতি,আনন্দ চন্দ্র শর্মা-র মতো পন্ডিতেরা।

তবে সেইসময়ের এই শেখার এক মজার ঘটনা জানা যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মীনওয়েল সাহেবের মুখে। সেইসময় দুর্ভিক্ষের খবর নিতে সাহেব এক গ্রামের চাষীকে জিজ্ঞাসা করেছিল–“টোমাডের গ্র‍্যাড়ামে ডুড়বেক্ষা ওঢিক আছে কিম্বা অল্প আছে??” এখানে বলা ভালো সেই চাষী সাহেবের প্রশ্ন বুঝতেই পারেনি। কাঁচুমাচু হয়ে বলেছিল–“হ্যাঁ হ্যাঁ, হুজুর মাপ করে দ্যান,মুই আর আসবোনি..”। গেরামিন লেবেদেফ বাংলা ভাষা শিখতেন পন্ডিত গোলকনাথের কাছে,আর পন্ডিত দক্ষিণা না নিয়ে সাহেবের কাছে শিখতেন পাশ্চাত্য সঙ্গীত।

সেইসময়ে আমাদের বাংলা ভাষায় প্রচুর হিন্দি, উর্দু, আরবি,ফারসী,ইংরেজি,ডাচ,ফরাসী,চীনা,ভাষা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।যা আজও আমাদের প্রাত্যহিক ব্যবহারিক জীবনে প্রবহমান। দেশী বিদেশী এই ভাষার মেলবন্ধনে এদেশীয়দের মুখের ইংরাজি ভাষাকে সাহেবরা বলতো –“বাবু ইংলিশ “, আর ওদেশীয়দের মুখে বাংলা ভাষাকে বলা হতো ” সাহেবী বাংলা”। এর একটা উদারন দেওয়া যাক– রাজা বিক্রমাদিত্যের দুই মহিষী ছিলেন–এই বাংলাটির ইংরাজি অনুবাদ হয়েছিল–
“কিং বিক্রমাদিত্য হ্যাড টু শী-বাফেলোজ্ “। এই গল্প ঘুরতো তখন বাঙালী পাড়ায়,আড্ডায়।

তবে এই পরিস্থিতিতে যথাযথ সমন্বয়ের কাজ করেছিলেন এদেশীয় বাঙালী মহিলারা।যারা ইতিহাসে চির উপেক্ষিতা। জোব চার্নক,এন্টনী গঞ্জালভেজ(এন্টনী ফিরিঙ্গী),ডি.এল.রিচার্ডসন, উইলিয়াম কেরী,বেথুন সাহেব,ডেভিড হেয়ার সহ অনেক সাহেবের ঘরে স্ত্রী হিসাবে,প্রধানা পরিচারিকা হিসাবে সসম্মানে স্থান পেয়েছিলেন এদেশীয় বাঙালী নারীরা। ফলে,সাহেবদের বাংলা ভাষার সঠিক উচ্চারণ, ব্যবহার,বাঙালির উৎসব পালা পার্বনে যুক্ত করে বাংলা সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা,বাঙালী খাওয়া-দাওয়ার সাথে পরিচিত হওয়া, এমনকি সুন্দর করে বাঙালি পোশাক পড়া,পান খেয়ে লাল টুকটুকে রাঙা ঠোঁট করা, হাতে অম্বুরি তামাকের হুঁকো-গড়গড়া ধরানো,হাতে তালপাতার পাখা ধরানো,–এসবই এই বাংলার সেই যুগের ওইসব মহীয়সী মহিলাদেরই অবদান ছিল। যা ইতিহাসে অনস্বীকার্য।

মাতৃভাষা দিবসের উদযাপনের মুহুর্তে সেই ইতিহাসও আমাদের আলোচিত হওয়া অতি প্রয়োজন। কিন্তু সেটা কি আমরা করি? করিনা। ইচ্ছে করে নয়,করিনা,করতে পারিনা সেটা আমাদের জানার বাইরেই রয়ে গেছে বলে। তাই বলা যায় আত্নবলিদানের অবদান যেমন আমাদের কাছে শ্রদ্ধায় স্মরণীয়, তেমনি এইসব অজানা ইতিহাসের অবদানকেও আমাদের স্মরণ করা উচিৎ।

মাতৃভাষার জয় হোক। মাতৃভাষাকে জানাই প্রণাম,জানাই সালাম।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সম্পাদকের পছন্দ

টাটকা খবর

©2023 newsonly24. All rights reserved.