নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে জয়ের উদ্যাপনে কলকাতায় বিজয় মিছিল করল বিজেপি। সোমবার উত্তর কলকাতার মুরলীধর সেন লেনে দলের পুরনো রাজ্য দফতরের সামনে থেকে মিছিল শুরু হয়। নেতৃত্বে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসল। মিছিল শেষে আয়কর ভবনের সামনে ভিক্টোরিয়া হাউসের কাছে তৈরি মঞ্চ থেকে ভাষণ দেন শুভেন্দু ও শমীক। সেখান থেকেই কলকাতা ও হাওড়ার পুরসভা দখলের লক্ষ্যে ‘ট্রিপল ইঞ্জিন’ সরকারের ডাক দেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘মোদীজির কথায় আপনারা ডবল ইঞ্জিন দিয়েছেন। এ বার মুখ্যমন্ত্রীর কথায় ট্রিপল ইঞ্জিন দিতে হবে। হাওড়া, কলকাতা দিতে হবে, কথা দিন।’’ অর্থাৎ, রাজ্য ও কেন্দ্রের পাশাপাশি কলকাতা ও হাওড়ার পুরসভাতেও বিজেপির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি। একই সুর শোনা যায় শুভেন্দুর বক্তব্যেও। নন্দীগ্রামে প্রচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এ বার কলকাতা ও হাওড়ার মানুষকে বিজেপির পাশে দাঁড়াতে হবে। সব ওয়ার্ডে পদ্ম ফোটানোর ডাকও দেন তিনি।
‘পরিবর্তনের বার্তা’ উপনির্বাচনের ফলাফলে, দাবি শমীকের
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের ফলাফলকে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর দাবি, এই নির্বাচনে রক্তপাত, বোমাবাজি, বুথ দখল বা প্রার্থীর উপর হামলার মতো ঘটনা ছাড়াই ভোট হয়েছে। শমীকের কথায়, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ একদলীয় রাজনৈতিক আধিপত্য থেকে মুক্তির বার্তা দিয়েছেন। তাঁর আরও দাবি, সাড়ে চার মাসের বিজেপি সরকারের কাজের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে এই দুই কেন্দ্রের ফলাফলে।
দুই বিজেপি নেতার বক্তব্যেই উঠে এসেছে সংখ্যালঘু ভোটের প্রসঙ্গ। শমীকের দাবি, সংখ্যালঘু সমাজের একাংশ বিজেপিকে ভোট দিতে শুরু করেছে। উন্নত ও বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ গড়ার বার্তায় এই জয় গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্য দিকে, শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, বিজেপি শুধু হিন্দুদের ভোটে নির্বাচিত হয়— এই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। তাঁর বক্তব্য, ধর্মপালনের অধিকার হারানো বা বাংলাদেশে চলে যেতে হওয়ার আশঙ্কা দেখিয়ে যে প্রচার করা হয়েছিল, তার পরেও বিজেপির জয় আটকানো যায়নি। রেজিনগরের মতো সংখ্যালঘু-প্রধান আসনে তৃণমূল প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তবে সংখ্যালঘু ভোটের বিষয়ে বিজেপি নেতাদের এই বক্তব্য তাঁদের রাজনৈতিক দাবি হিসেবেই উঠে এসেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ
বিজয় মঞ্চ থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের বিরুদ্ধেও সরব হন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, ভোটের আগে বাঙালি-অবাঙালি বিভাজনের রাজনীতি করা হয়েছিল। পাহাড়ে বিভিন্ন বোর্ড গঠন এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টার অভিযোগও তোলেন তিনি। শুভেন্দুর দাবি, তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করেই বিজেপি নির্বাচনে সাফল্য পেয়েছে।
ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে জমায়েত ঘিরে বিতর্ক
বিজেপির বিজয় মিছিলের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে সভার স্থানও। আয়কর ভবনের সামনে ভিক্টোরিয়া হাউসের কাছে জমায়েত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল। তাদের বক্তব্য, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ওই এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকলে বিজেপি কী ভাবে সেখানে মঞ্চ তৈরি করে জমায়েত করল?
তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের অভিযোগ, চলতি বছরের ২১ জুলাই ওই একই জায়গায় শহিদ দিবসের সমাবেশ করার অনুমতি পায়নি তৃণমূল। ২০১৮ সালের একটি মামলায় আদালতের নির্দেশের কথা উল্লেখ করে পুলিশ অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি। কুণালের প্রশ্ন, তৃণমূলের বিরুদ্ধে যেখানে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল, সেখানে বিজেপিকে মঞ্চ তৈরির অনুমতি দেওয়া হল কী ভাবে?
রাজ্যের মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, আইন ভাঙার প্রতিযোগিতা চলছে এবং ক্ষমতায় থাকার কারণে বিজেপি যা খুশি করছে। তবে বিজেপি এই অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের পাল্টা দাবি, জনতার রায়ে তৃণমূল অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ফলে তৃণমূল নেতাদের মন্তব্য নিয়ে বিজেপির কিছু বলার নেই বলেও জানান তিনি।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের জয় উদ্যাপনকে সামনে রেখে বিজেপি কার্যত কলকাতা ও হাওড়ার পুরভোটের প্রচারের সুর বেঁধে দিল। অন্য দিকে, বিজয় মিছিলের সভাস্থল ঘিরে তৃণমূলের প্রশ্নে নতুন করে সামনে এল রাজনৈতিক জমায়েতের অনুমতি ও আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার বিতর্ক।