রেজিনগর ও নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে বিজেপির বড় জয় ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। বিশেষ করে মুসলিম-অধ্যুষিত রেজিনগরে বিজেপির জয়ের ব্যবধান এবং নন্দীগ্রামে বিপুল ভোটে জয়কে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু ভোটের গতিপ্রকৃতি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। ফল প্রকাশের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “বন্ধুত্ব বানিয়ে নিয়েছেন।” তাঁর দাবি, ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির বাইরে গিয়ে উন্নয়ন ও সরকারি প্রকল্পের কথা মাথায় রেখেই মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে, বিরোধীদের অভিযোগ, এই ফল জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন নয়; নির্বাচনে ভোটলুট হয়েছে।
নন্দীগ্রামে লক্ষাধিক ভোটে জয় বিজেপির
প্রদত্ত ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪২৭ ভোট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের প্রাপ্ত ভোট ৪১ হাজার ৬৭৪। ফলে দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩ ভোটে।
এই ব্যবধানকে রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনী রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তা মহিলারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।
রেজিনগরে মুসলিম ভোটের সমীকরণে বদল?
রেজিনগরে বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার ৭০ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ মুসলিম ভোটার থাকা এই কেন্দ্রে বিজেপির জয় রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
গত বিধানসভা নির্বাচনে রেজিনগর থেকে জয়ী হয়েছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর। তাঁর দলের প্রার্থী হিসেবে এবারের উপনির্বাচনে লড়েছিলেন তাঁর পুত্র গোলাম নবি আজাদ। কিন্তু বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে অতীতে যে রাজনৈতিক প্রচার দেখা গিয়েছিল, তা এবার ভোটে সাফল্য এনে দিতে পারেনি বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, রেজিনগরের সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশও বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তাদের ভোটের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই মহিলাদের সমর্থন ছাড়া এত বড় জয় সম্ভব হত না। তবে ভোটের ফল থেকে নির্দিষ্ট কোনও সম্প্রদায়ের ভোট কোন দিকে গিয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না—তার জন্য বুথভিত্তিক ফল ও নির্ভরযোগ্য নির্বাচনী বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
হুমায়ুন কবীরের অভিযোগ, প্রচারে ধাক্কা
রেজিনগরের ফল প্রকাশের পর হুমায়ুন কবীরের বক্তব্যও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে কথা দিয়েছিলেন যে রেজিনগরে তাঁর পুত্র জয়ী হবেন। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। যদিও এই দাবি নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী কোনও মন্তব্য করেছেন কি না, তা প্রদত্ত তথ্যে স্পষ্ট নয়।
এদিকে, দলের একাধিক নেতা-কর্মীর গ্রেফতারির কারণে প্রচারে ধাক্কা লেগেছিল বলে হুমায়ুনের শিবিরের বক্তব্য। শেষ দিকে প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ভোটের ফল নিয়ে তাঁর অসন্তোষও সামনে আসে।
ভোটলুটের অভিযোগ বিরোধীদের
বিজেপির জয়ের পর বিরোধী দলগুলি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তৃণমূলের বিধায়ক আলিফা আহমেদের অভিযোগ, রেজিনগরে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও ভোটলুটের অভিযোগ করেছেন। বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, বিজেপি সংখ্যালঘুদের ভোট পায়নি; বরং ভোটে কারচুপি হয়েছে।
অন্যদিকে, ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, দুটি আসনেই বিজেপি জেতায় তারা সব সম্প্রদায়ের মানুষের ভোট পেয়েছে—এমনটাই ধরে নেওয়া স্বাভাবিক। তিনি গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার বজায় রেখে জয়ী দলকে অভিনন্দন জানানোর পক্ষেও মত প্রকাশ করেছেন।
রেজিনগর ও নন্দীগ্রামের ফল তাই শুধু দুই আসনের জয়-পরাজয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সংখ্যালঘু ভোটের গতিপ্রকৃতি, সরকারি প্রকল্পের প্রভাব এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক—সব মিলিয়ে এই ফল রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।