প্রথম পাতা খবর ‘বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না!’কলকাতার অনুষ্ঠানে আবেগঘন বার্তা তসলিমার, সংবর্ধনা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

‘বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না!’কলকাতার অনুষ্ঠানে আবেগঘন বার্তা তসলিমার, সংবর্ধনা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

8 views
A+A-
Reset

দীর্ঘ ১৯ বছর পর আবার কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। ২০২৬ সালে সেই শহরেই ফিরে এসে নির্বাসনের যন্ত্রণা, হারিয়ে ফেলা ঘরের স্মৃতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো বার্তা দিলেন তিনি।

শনিবার কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে সংবর্ধিত হন তসলিমা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সংবর্ধনা গ্রহণ করে আবেগঘন ভাষণে তসলিমা বলেন, “ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল। ইতিহাস মনে রাখবে কারা দরজা খুলেছিল।” পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জন্য দরজা খুলে দেওয়ায় তিনি রাজ্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

‘নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা’

ভাষণের বড় অংশ জুড়ে ছিল নির্বাসনের দীর্ঘ যন্ত্রণার কথা। তসলিমা বলেন, “নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা। প্রতি মাস অপেক্ষার, প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখের। এত দীর্ঘ অপেক্ষার পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি, ফিরে এসেছি একটি অধ্যায়ের কাছে।”

শুভেন্দুর আশ্বাস, ‘আপনি যখন ইচ্ছা আসবেন’

অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর। আপনি যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা আসবেন, কথা বলবেন।”

এর জবাবে তসলিমা বলেন, এই সম্মান তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল এবং মুখ্যমন্ত্রীর উদারতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।

‘লেখকের পুলিশের পাহারায় চলা বেদনাদায়ক’

কলকাতা বিমানবন্দর থেকে অনুষ্ঠানস্থল পর্যন্ত তসলিমার জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই নিরাপত্তার জন্য রাজ্য সরকারকে ধন্যবাদ জানালেও তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, “একজন লেখককে তাঁর ভাষার শহরে আসতে পুলিশের পাহারার প্রয়োজন হওয়াটাই বেদনাদায়ক সত্য। আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি, যেদিন কোনও লেখককে পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না, ভিন্ন মতের জন্য কাউকে দেশ ছাড়তে হবে না।”

‘কৃতজ্ঞতা মানে স্বাধীন চিন্তা বন্ধক নয়’

রাজ্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তসলিমা স্পষ্ট করে দেন, “কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিই না।”

তিনি আরও বলেন, কোনও ভালো কাজের প্রশংসা করতে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রয়োজন নেই এবং মতভেদ প্রকাশ করতেও বিদ্বেষের দরকার হয় না। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, একজন স্বাধীন লেখক হিসেবেই বক্তব্য রাখতে এসেছেন বলে জানান।

কলকাতা, নির্বাসন ও হারিয়ে যাওয়া ঘর

তসলিমা স্মরণ করেন, ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় কলকাতায় বসবাস করলেও ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে শহর ছাড়তে বাধ্য করে।

তাঁর কথায়, “আমি কোনও অপরাধ করিনি। কোনও আদালত আমাকে নির্বাসনের নির্দেশ দেয়নি। তবুও মৌলবাদীদের হুমকির মূল্য দিতে হয়েছিল।”

তিনি বলেন, ইউরোপ তাঁকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু সেই আশ্রয় কখনও নিজের ঘর হয়ে ওঠেনি। কলকাতাকেই তিনি নিজের ঘর বলে মনে করেন।

সব ধরনের মৌলবাদের বিরোধিতার বার্তা

ভাষণের শেষ অংশে ধর্মীয় মৌলবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তসলিমা। তিনি বলেন, কোনও ধর্মই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় এবং তিনি সব ধরনের মৌলবাদের বিরোধী।

ভারত ও বাংলাদেশ— দুই দেশেই ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, মানবাধিকার ও সমানাধিকারের ভিত্তিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের পক্ষে মত দেন তিনি।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.