প্রথম পাতা প্রবন্ধ দোল-পূর্ণিমার রঙে মানবতার আহ্বান: বসন্ত, বেদনা ও মহামিলনের উৎসব

দোল-পূর্ণিমার রঙে মানবতার আহ্বান: বসন্ত, বেদনা ও মহামিলনের উৎসব

11 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

এ তুমি কেমন তুমি? যার পরশে আকুল-বিকুল হলুদ-খয়েরি ঝরাপাতারা পথের বুকে একা একা বিষণ্নতায় শুয়ে থাকে! আবার সেই তোমারই আলতো স্পর্শে ফাগুন রোদের নকশীকাঁথা জড়িয়ে কচি পাতারা সদ্যোজাত কৌতূহলে চোখ মেলে চায়।

তোমার আগমনে ঝরে পড়ে শিমুল, রক্তপলাশ। আমের বউলের মাদক গন্ধে মুখরিত হয় বাতাস। বসন্তদূত কোকিল ডেকে চলে অরণ্যের নিরালায় একাকী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গেয়ে ওঠেন—
“আজি দখিন দুয়ার খোলা, আমার বসন্ত এসো…”

কিন্তু বসন্ত কি শুধু কাব্যে, লাস্যে? না, সে আসে গরিব ঘরের আটপৌরে উঠোনে, এক চিলতে বারান্দায়, পথের ধারের ছিন্নমূল সংসারেও।

রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে আবার বেদনার সুর—
“নীল দিগন্তে মোর বেদনাখানি লাগল…”

তাই যাদের কথা কেউ বলে না, যাদের পাশে কেউ নেই, তাদেরও আজ নিয়ে আসতে হবে সবার মাঝে, সবার সঙ্গে রঙ মিলনতিতে।

এই বেদন কি রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন তাঁর পূর্বজ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব প্রমুখদের জীবনবাণী থেকে?

হয়তো তাই। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে ছিল না ভেদাভেদ, ছিল না শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছেও। তাই তো মহাপ্রভুর বাণী ছড়িয়ে যায় বসন্তের আবাহনে—
“মানুষে মানুষে কোনও ভেদ নেই। আমার নিত্যানন্দ আর আমার যবন হরিদাস দুই নয়নের মণি। সবার মধ্যেই কৃষ্ণ বিরাজমান। বলো একবার—হরি হরি হরিবোল।”

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁর অমৃতবাণীতে বলেন—
“শিবজ্ঞানে জীবসেবা কর। ওরে গোপাল, সে তো সবখানেতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। মন দিয়ে দেখ, দেখতে পাবে।”

এইসব মহাবাণীর উত্তরীয় পরেই আসে বসন্ত, আসে বসন্তোৎসব, ফাগুনের ফাগ-ফাগুনিয়া, আসে দোল, আসে হোলি।
“আজি সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে।”

আসলে দোল-হোলি শুধু একদিনের উৎসব নয়। এর দীর্ঘ উদযাপন। এর শুরু মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী তথা সরস্বতী পূজার দিন, আর শেষ বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধপূর্ণিমায়, যার আরেক নাম ফুলদোল।

প্রাচীন কালে লীলাচ্ছ্বলে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধার যুগলপ্রেমের সুবাসে বিশ্বপ্রেমের আবাহনে বৃন্দাবন ও মথুরায় শুরু হয়েছিল রাধাকৃষ্ণের দোলযাত্রা।

এরপর নবদ্বীপের অন্তদ্বীপ, সীমন্তদ্বীপ, গোদ্রুমদ্বীপ, মধ্যদ্বীপ, কোলদ্বীপ, ঋতুদ্বীপ, জহ্নুদ্বীপ, মোদদ্রুমদ্বীপ ও রুদ্রদ্বীপ পরিক্রমায় সম্পূর্ণ হয় গৌরদোল।

শুধু কি বাংলায়? দোল-হোলির এই উৎসব সারা দেশজুড়ে রঙিন আবেশে পালিত হয়—উত্তর প্রদেশে লাঠমার হোলি, পাঞ্জাবে হোলা মহল্লা, মহারাষ্ট্রে রংপঞ্চমী, উত্তরাখণ্ডে কুমায়নী হোলি, ওড়িশায় দোল পূর্ণশশী, অসমে দোলযাত্রা। বাংলায় এর আরেক নাম বসন্তোৎসব—বিশেষত শান্তিনিকেতনে অনন্য রূপে পালিত হয়।

দেশের বাইরেও এই উৎসবের ছোঁয়া—নেপালে ফাগুন পূর্ণিমা, ত্রিনিদাদ-টোবাগোতে ফাগুয়া, ফিজিতে পাগুয়া, সুরিনাম ও গায়ানায় হোলিকন্দা।

ভুবনডাঙ্গার মাঠ, চুরুলিয়ার পুকুরপাড়, ধলেশ্বরীর তীর, কপোতাক্ষ নদীর ধারে—সবখানেই বসন্ত একাকার করে দেয় লাবণ্য, সুচরিতা, বনলতা সেন, নীরা, রাজলক্ষ্মী, কমললতা, অভয়া, রমা, বিজয়া, আমিনা, অভাগী, কুড়ানী—সব চরিত্র, সব মানুষকে।

জাতপাত ভেদ ভুলে মা যেমন খই, মুড়কি, মঠ নিয়ে আদরে দাঁড়িয়ে থাকেন, তেমনি এই বসন্তও সকলকে টেনে নেয় আপন করে।

আজকের অস্থির, অসহিষ্ণু সময়ে আমাদের জীবন অনেক সময় সংকীর্ণতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ আমাদের সব উৎসব মানচিত্রে যতটা সীমাবদ্ধ, তার চেয়ে অনেক বেশি মনোচিত্রে অসীম।

এই সময়ের পৃথিবীতে, সমাজে, পরিবারে—কালের ঘূর্ণিপাকে গোলকধাঁধায় পথ হারানো মানুষের মাঝে আবার উচ্চারিত হোক শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী, আবার জেগে উঠুক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের অমোঘ উচ্চারণ—
“চৈতন্য হোক, তোদের সকলের চৈতন্য হোক।”

বসন্তের এই ফাগুনী পূর্ণিমা—দোল পূর্ণিমার সোনালি রোদের আলোয়, জ্যোৎস্নার সলমা-জরির স্নিগ্ধতায় আমাদের অন্তর স্নানিত হয়ে উঠুক ভালোবাসার সুবাসে। সেই সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক অন্তর থেকে অন্তরে।

শুরু হোক মহামানবিক, মহাজাগতিক বসন্তোৎসব—
সকলের মহা উদযাপনে।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.