প্রথম পাতা প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় ছদ্মনামের ঐতিহ্য: ভলতেয়ার থেকে নীললোহিত

বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় ছদ্মনামের ঐতিহ্য: ভলতেয়ার থেকে নীললোহিত

16 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

মোটামুটিভাবে ইতিহাস থেকে জানা যায়, যে বিগত অষ্টাদশ শতকেই ছদ্মনামের ব্যবহার শুরু হয়। সংবাদপত্র, অন্যান্য সাময়িক পত্র-পত্রিকা প্রকাশের সময় থেকেই এই ছদ্মনামের ব্যবহার চালু হয়েছিল। এই ছদ্মনাম ব্যবহারের প্রাথমিক কারণ বলতে জানা যায় যে, স্বকীয় মতামত প্রকাশের জন্য সমকালীন শাসকের রোষের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্যই এই ছদ্মনামের ব্যবহার শুরু হয়েছিল।

প্রথম যুগে সবচেয়ে বিখ্যাত তথা জনপ্রিয় ছদ্মনাম ছিল “ভলতেয়ার”। ১৭১৮ সালে ফরাসী লেখক ফ্রাঙ্কোইসি মেরি আরুয়েট এই ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তারপর গত ঊনবিংশ শতাব্দীতে বহু লেখিকা ছদ্মনাম হিসাবে পুরুষের নাম, এবং বহু লেখক ছদ্মনাম হিসাবে মহিলাদের নাম ব্যবহার করতেন। এরমধ্যে বিখ্যাত হলেন মেরি এন ইভান্স। তিনি শুরু করেন লেখা “জর্জ এলিয়ট” ছদ্মনামে।

আমাদের বাংলা সাহিত্য ও কাব্য জগতেও এইরকম ছদ্মনামে বহু প্রথিতযশা সাহিত্যিক, কবি লিখেছেন তাঁদের অমর সৃষ্টি। তাঁরা হলেন, যথা, কবি ভারত চন্দ্র রায় (রায়গুণাকর), রাজা রামমোহন রায় -(শিবপ্রসাদ রায়), মাইকেল মধুসূদন দত্ত (টিমোথী পেন পোয়েম), ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর (কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য/ কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপো সহচিরস্য), কালীপ্রসন্ন সিংহ (হুতোম প্যাঁচা), প্যারীচাঁদ মিত্র (টেকচাঁদ ঠাকুর), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (কমলাকান্ত/ মুচিরাম গুড়/ দর্পনারায়ণ পতিতুন্ড), হরিনাথ মজুমদার (কাঙাল হরিনাথ), মীর মোশাররফ্ হোসেন (গাজী মিয়াঁ), গিরিশচন্দ্র ঘোষ (মুকুট চরণ মিত্র), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ভানু সিংহ, আন্নাকালি পাকড়াশী, শ্রীমতী মধ্যমা, শ্রীমতী কণিষ্ঠা, দিকশূন্য ভট্টাচার্য, বাণীবিনোদ বিদ্যাবিনোদ, অকপট চন্দ্র ভাস্কর, ষষ্ঠীচরণ দেবশর্মা, নবীন কিশোর দেবশর্মনঃ), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (অনিলা দেবী, অপরূপা দেবী, রানু দেবী, শ্রীকান্ত শর্মা), কাজী নজরুল ইসলাম (ব্যাঙাচি/ ধুমকেতু), শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (গৌড়মল্লার), প্রমথনাথ বিশী (প্র.না.বি), সুকুমার রায় (উহ্যনাম পন্ডিত), সোমেন চন্দ (ইন্দ্রকুমার সোম), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (হাবুশর্মা), রাজশেখর বসু (পরশুরাম), বিমল ঘোষ (মৌমাছি), অখিল নিয়োগী (স্বপনবুড়ো), সৈয়দ মুজতবা আলী (সত্যপীর, সত্যব্রত শর্মা, মুসাফির, বৈকুন্ঠ শর্মা), দুলাল মুখোপাধ্যায় (অবধুত), প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় (রাধারাণী দেবী), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (নীললোহিত), সমরেশ বসু (কালকূট / ভ্রমর), বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল), নীহাররঞ্জন গুপ্ত (বাণভট্ট), নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (সুনন্দ/ বিকর্ণ), চারুচন্দ্র চক্রবর্তী (জরাসন্ধ), বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (শ্রী বিরূপাক্ষ), বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য (বাণীকুমার), বিনয় ঘোষ (কালপেঁচা), বিনয় মুখোপাধ্যায় (যাযাবর), আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (শ্রীবাস), অন্নদাশঙ্কর রায় (লীলাময় রায়/ সুচরিতা), বিভুতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (ক্বচিৎ প্রৌঢ়), প্রেমেন্দ্র মিত্র (কৃত্তিবাস/ পোখরাজ সামন্ত), সুবোধ ঘোষ (কালপুরুষ /সুপান্থ), বিমল কর (বিদুর), জীবনানন্দ দাশ (শ্রী), বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায় (নাদাপেটা হাঁদারাম), মোহিতলাল মজুমদার (সত্যসুন্দর দাস), সতীনাথ ভাদুড়ি (চিত্রগুপ্ত), শক্তিপদ রাজগুরু (পঞ্চমুখ), সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (নবকুমার কবিরত্ন / কিংশুক), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (নীহারিকা দেবী), শরৎচন্দ্র পন্ডিত (দাদাঠাকুর), ভবানী সেনগুপ্ত (চানক্য সেন), দীপেন্দ্র সান্যাল (নীলকন্ঠ), শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (চন্দ্রহাস), মধুসূদন মজুমদার (দৃষ্টিহীন), সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় (বীরভদ্র), গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী), শম্ভু মিত্র (শ্রী সঞ্জীব), মহাশ্বেতা দেবী (সুমিত্রা দেবী), প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়), প্রেমাঙ্কুর আতর্থী (মহাস্থবির), দীনেশ চন্দ্র সেন (বাহাদুর), দেবেশ চন্দ্র মিত্র (বেদুইন), কামিনী রায় (লীলাবতী/ জনৈক বঙ্গমহিলা), শৈলেশ দে (বহুরূপী), ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (পাঁচু ঠাকুর), বিমল মিত্র (জাবালী/ সনাতন পাঠক), তারাপদ রায় (গ্রন্থকীট), দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (শ্রী কাব্যানন্দ), মনিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় (শংকর), অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রসুল আলী), পুর্ণেন্দু পত্রী (সমুদ্র গুপ্ত)।

এছাড়াও আরও বহু সুবিখ্যাত ব্যক্তিদের ছদ্মনাম রয়েছে। এই অল্প পরিসরে তা সঙ্কুলান হবে না। তবে এইসব প্রথিতযশা ব্যক্তিদের এইসব ছদ্মনামগুলি আমাদের সংগ্রহের সংকলনে থাকলে আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাজে লাগতে পারে, এক ঐতিহ্য এবং পরম্পরা হিসাবে।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.