প্রথম পাতা প্রবন্ধ ডেট্রয়েটে বিষমিশ্রিত কফি! অলৌকিক সতর্কবার্তায় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান স্বামী বিবেকানন্দ

ডেট্রয়েটে বিষমিশ্রিত কফি! অলৌকিক সতর্কবার্তায় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান স্বামী বিবেকানন্দ

18 views
A+A-
Reset

সময়টা ১৮৯৪ সাল। মার্চ মাস। আমেরিকার ডেট্রয়েট শহর।

স্বামী বিবেকানন্দ তখন সারা আমেরিকায় একজন সর্বজনবিদিত পরিচিত ব্যক্তিত্ব, প্রচণ্ড জনপ্রিয় জ্ঞানী মানুষ হিসেবে সকলেরই শ্রদ্ধেয়। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাই যেন তাঁর প্রতি কিছু স্বার্থপর মানুষের হিংসার কারণ হয়ে উঠেছিল। এক মারাত্মক ষড়যন্ত্র সেইসব পরশ্রীকাতর কুচক্রী অসাধু ব্যক্তি তথা মিশনারিরা করেছিল, যাদের কাছে স্বামী বিবেকানন্দের জনপ্রিয়তা সেদিন চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল।

সেই যুগে এইসব মিশনারিদের একটি অংশ একটি অতি জঘন্য নোংরা মিথ্যে গল্প প্রচার করত আমেরিকা তথা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। সেটা হল ভারতবর্ষের নামে নানা কুৎসা প্রচার। তারা বলে বেড়াত যে ভারতীয়রা একটি অসভ্য, বর্বর, অশিক্ষিত জাতি। তারা সমাজে নানারকম অসভ্য, অমানবিক কাজ করে বেড়ায়। কোনও শিক্ষা নেই, কোনও সংস্কৃতি নেই, মেয়েদের পুড়িয়ে মারে, নিজেদের সন্তানদের নদীতে ফেলে দেয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এইসব মিথ্যে গল্প শুনিয়ে অসভ্য অশিক্ষিত ভারতীয়দের সভ্য করার জন্য, শিক্ষা দানের জন্য নানা পরিকল্পনার নাম করে আমেরিকানদের ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে তাদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করত।

কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো মহাসভায় ১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সেই যে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দেন, এবং বলেন যে ভারতীয় সমাজের কিছু অন্যায় অবিচার মুষ্টিমেয় কিছু কূপমণ্ডূক অমানুষের দ্বারা হলেও আসলে ভারতবর্ষ কত মহান, কত প্রাচীন, কত সংবেদনশীল তার ঐতিহ্য, পরম্পরা, সংস্কৃতি, তার প্রাচীন ইতিহাস কত গৌরবময়, ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন আমেরিকানরা স্বামীজির কথা, তাঁর ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ অত্যন্ত সাগ্রহ সহকারে বুঝলেন, জানতে পারলেন ভারতের, ভারতীয় সভ্যতার আসল ইতিহাস। তখন তারা স্বামীজির প্রতি দলে দলে আকৃষ্ট হতে লাগলেন। এর ফলে যে সমস্ত অসাধুরা ভারতের নামে অপপ্রচার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য তহবিল তৈরি করছিল, তাদের বাড়া ভাতে ছাই পড়ল। মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিল তাদের থেকে। সেইসব ধান্দাবাজদের অর্থ উপার্জনে টান পড়তে লাগল। তারা ক্ষেপে উঠল স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি। এবং শেষমেশ তারা এক গভীর জঘন্য ষড়যন্ত্র করল স্বামী বিবেকানন্দকে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরানোর জন্য, প্রয়োজনে হত্যা।

সেই উদ্দেশ্যেই ১৮৯৪ সালের ২৮শে মার্চ, ডেট্রয়েট শহরের এক বিরাট ধনী ব্যক্তির বাড়িতে খুব খাতির করে স্বামী বিবেকানন্দকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হল। নৈশভোজের শেষে আমেরিকানদের প্রথা অনুযায়ী সকলের হাতে গরম কফির পেয়ালা দেওয়া হল, স্বামীজিকেও দেওয়া হল। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা ছাড়া আর কেউ জানত না যে, স্বামী বিবেকানন্দকে দেওয়া সেই কফির পেয়ালায় মারাত্মক বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা খেলেই অবধারিতভাবে স্বামীজির মৃত্যু হবে, আর সবাই জানবে যে স্বামীজির হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে।

যাই হোক, স্বামীজি যথারীতি সেই কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে চুমুক দিতে যাবেন, এমন সময় ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। সেই বিরাট হলঘরের বিশাল একটি ঝাড়লণ্ঠন অকস্মাৎ ছাদ থেকে ছিঁড়ে পড়ে গেল মাটিতে। বিকট আওয়াজ এবং সেই ঝাড়লণ্ঠনের চুরমার হয়ে ভেঙে যাওয়ার আকস্মিকতায় সকলেই স্তম্ভিত, সন্ত্রস্ত হয়ে চারদিকে প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি করতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই স্বামী বিবেকানন্দের কানের কাছে কেউ যেন সাবধান করে বলে উঠলেন— “নরেন, থাম—খাসনি ওটা, ওতে বিষ মেশানো আছে।” স্বামী বিবেকানন্দের মনে হল, এ তো ঠাকুরের কণ্ঠস্বর, এ তো স্বামীজির পরমগুরু পরমপুরুষ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাবধানবাণী। স্বামীজির হাত থমকে গেল। তিনি শান্তভাবে বিষ দেওয়া সেই কফির পেয়ালা মাটিতে ফেলে দিলেন। সবাই তখন ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। ষড়যন্ত্রকারীদের কারোরই দৃষ্টি নেই তখন স্বামীজির দিকে। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেন স্বামী বিবেকানন্দ। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে মনে মনে কৃতজ্ঞতায় প্রণাম জানালেন স্বামী বিবেকানন্দ।

এই ঘটনাটি পরবর্তী সময়ে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভাই স্বামী ব্রহ্মানন্দজীকে, স্বামী বিজ্ঞানানন্দজীকে এবং স্বামীজির অন্যতম শিষ্যা মিসেস এলিস এম হ্যান্সব্রোকে জানিয়েছিলেন। আর বারবার বলেছিলেন অশ্রুসজল নয়নে কৃতজ্ঞতায় ঠাকুরের অপার অলৌকিক লীলার কথা, যা কল্পনা করলে আজও শিহরণ জাগে। মাথা নত হয়ে যায় ঠাকুরের শ্রীপাদপদ্মে।

এই অলৌকিক ঘটনা প্রমাণ করে দেয়, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব সূক্ষ্ম শরীরে সর্বত্র বিরাজমান। সেদিনও ছিলেন, আজও আছেন, অনন্তকাল ধরেই থাকবেন।

 শতকোটি প্রণাম তাঁর শ্রীচরণে।

তথ্যসূত্র:

১/ স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিচারণ — মিসেস এলিস এম হ্যান্সব্রো

২/ স্বামী বিবেকানন্দের কালানুক্রম (মার্চ ১৮৯৪, ডেট্রয়েট সফর)

৩/ স্বামী বিজ্ঞানানন্দের বিবরণে স্বামী বিবেকানন্দের আমেরিকার দিনগুলি

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.