পঙ্কজ চট্টাপাধ্যায়
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। আর বাঙালির ঘরে ঘরে পালিত হয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পার্বণের উৎসব।
তারই মধ্যে অন্যতম হলো বাঙালির ঘরে ঘরে পরিবারের মেয়ে এবং তার বা তাদের সন্তান-সন্ততিদের মঙ্গলকামনায় পালিত ‘জামাইষষ্ঠী’ পার্বণ।
এই উৎসবের কথা বা কাহিনি পাওয়া যায় ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে যে, পুরাকালে রাজা প্রিয়ব্রত এবং রানি মালিনীর সন্তানরা জন্মের পরই অকালমৃত্যুর শিকার হতো। সেই মর্মান্তিক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য রাজা ও রানি দেবতার কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করেন। দীর্ঘ প্রার্থনার শেষে দৈববাণী হয় যে, আষাঢ় মাসের শুক্লা ষষ্ঠীতে দেবী ষষ্ঠীমাতার আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে এই জামাইষষ্ঠী ব্রত ও উৎসব পালিত হবে।
পঞ্চদশ শতকের প্রথম দিক থেকেই সমগ্র অখণ্ড বাংলায় এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এই জামাইষষ্ঠী উৎসব ও ব্রত পালিত হয়ে আসছে।
বাংলায় যেমন জামাইষষ্ঠী, তেমনই ওড়িশায় ‘জামাতা কোটি’ পালন করা হয়। বিহার ও ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে ‘দামাদ তিথি’, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে ‘দামাদ সাজ্জি’, রাজস্থানে ‘দামাদ কারিয়া’ ইত্যাদি নামে বাঙালির ও বাংলার জামাইষষ্ঠীর অনুরূপ উৎসব পালিত হয়।
পরিবারের মেয়ে, মেয়েদের সন্তান এবং তাদের শুভকামনায় এই উৎসব সেই কোন প্রাচীনকাল থেকে পালিত হয়ে আসছে।
এই দিনে পরিবারের মেয়ে-জামাইরা আসে মেয়ের বাপের বাড়িতে। বাপের বাড়ির যার যেমন সাধ্য, তেমনই আপ্যায়ন ও সমাদর করা হয় মেয়ে-জামাইয়ের।
বাংলায় তো প্রবাদই তৈরি হয়ে গিয়েছে— ‘জামাই আদর’। অত্যন্ত আন্তরিক ও সমৃদ্ধ আপ্যায়নের প্রেক্ষিতে এই প্রবাদ আজও বহুল প্রচলিত। একইভাবে হিন্দিতেও শোনা যায়— ‘জামাই খাতির’।
বাংলা ও বাঙালির ঘরে ঘরে জামাইরা নিজের জন্মদায়িনী মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করেন তাঁদের শাশুড়িমাকে। অপরদিকে শাশুড়িমাও মেয়ের বর অর্থাৎ জামাইকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করেন, ভালোবাসেন এবং তাঁর মঙ্গলকামনা করেন আন্তরিকভাবে।
এই পরম্পরা, এই ঐতিহ্য আজও প্রবহমান সেই কোন প্রাচীনকাল থেকে। যেখানে রয়েছে শুধু ভালোবাসা, স্নেহ, দরদ, শ্রদ্ধা এবং শুভকামনা।
ভালো থাকুক ঘরে ঘরে মায়ের মতো শাশুড়িমায়েরা, ভালো থাকুক মেয়েরা, জামাইরা। আর পরের ছেলেকে যেমন মেয়ের মা নিজের সন্তানের স্নেহে আপন করে নেন, তেমনই যখন অন্য বাড়ির একটি মেয়ে পুত্রবধূ হয়ে নতুন পরিবারে আসে, তখন তাকেও নিজের মেয়ের মতো আপন করে নেওয়া উচিত।
আরও ভালো হয় যদি সমাজে মেয়েদের জন্যও জামাইষষ্ঠীর মতো একটি বিশেষ দিন বা উৎসবের প্রচলন হয়। যদি পুত্রবধূ রূপে আসা অন্য বাড়ির মেয়েটিকেও সমান ভালোবাসা, সম্মান ও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করার লক্ষ্যে ‘বৌমা-ষষ্ঠী’ উৎসবের আয়োজন করা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে পারিবারিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং ভালোবাসার এই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।