প্রথম পাতা প্রবন্ধ শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব—একটি বিনম্র নিবেদন

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব—একটি বিনম্র নিবেদন

8 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

চিকিৎসার জন্য শ্রী রামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর থেকে এলেন কলকাতার শ্যামপুকুরে। সেখান থেকে ১১ই ডিসেম্বর, ১৮৮৫ সালে এলেন কাশীপুরের উদ্যানবাটিতে। এখানে তিনি ছিলেন মহাসমাধির দিন ১৬ই আগস্ট, ১৮৮৬ অবধি, প্রায় আট মাস।

শ্রীমা সঙ্গে ছিলেন, ছিলেন অন্যান্য ভক্তরাও। কাশীপুরে দোতলা বাড়ি। একতলার পূর্বদিকের একটি ছোট ঘরে শ্রীমায়ের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল।

শ্রী রামকৃষ্ণের সেবায় ভক্ত সন্ন্যাসীরা নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলেন দিনরাত এক করে। পাশাপাশি শ্রীমায়ের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেদিকেও তাঁদের নজর ছিল অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সঙ্গে।

শ্রীরামকৃষ্ণ একদিন লাটু মহারাজকে বলেছিলেন,—“তুই ইখানকার সব জিনিস দেখবি।” লাটু মহারাজ (স্বামী অদ্ভুতানন্দ) সারাক্ষণ তাই করতেন—অসুস্থ ঠাকুরের মলমূত্র সাফ পর্যন্ত নিজের হাতে করতেন। তিনি ছাড়াও নরেন্দ্রনাথ (স্বামী বিবেকানন্দ), রাখাল (স্বামী ব্রহ্মানন্দ), কালী (স্বামী অভেদানন্দ), শশী (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ), শরৎ (স্বামী সারদানন্দ), প্রমুখরা ঠাকুরের সমস্ত পরিচর্যায় নিজেদের নিয়মিত নিয়োজিত করেছিলেন। ঠাকুরের গলার রোগ-ক্ষত থেকে নির্গত পুঁজ, রক্ত, রক্ত-রস, ইত্যাদি অবধি পরম যত্নে পরিষ্কার করতেন। গা মুছিয়ে দিতেন লাটু। নিয়মিতভাবে আসতেন গিরিশচন্দ্র, বলরাম বসু, শ্রীম, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার, রামচন্দ্র দত্ত, সহ আরও অনেক অনেক গৃহী ভক্তরা।

রামচন্দ্র দত্ত ঠাকুরের পথ্য তৈরির জন্যে একজন বামুন পাচক ঠাকুর পাঠিয়েছিলেন। ঠাকুর ভালো করে খেতে পারতেন না সেই সময়ে, শ্রীমা নিজের হাতে ঠাকুরকে খাইয়ে দিতেন। মা-কে সাহায্য করতেন লাটু মহারাজ এবং অন্যান্য সন্ন্যাসী সন্তানরা।

সকলে মিলে সেই দিনগুলিতে ঠাকুরকে অতি যত্ন করে মনপ্রাণ দিয়ে সেবা করতেন ইষ্ট জ্ঞানে।

এই প্রেক্ষিতে একটি ঘটনা বড়ই মহা পবিত্র শিক্ষার, আর তা হল, একজন গৃহীভক্ত অনেক পরে লাটু মহারাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “মহারাজ। কাশীপুরে আপনারা সারাদিন তাঁর সেবাই করতেন, উপাসনা করতেন না?” এই প্রশ্ন শুনে লাটু মহারাজ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন: “আরে! তাঁর সেবাই তো হামাদের উপাসনা। হামাদের কি আর অন্য উপাসনা আছে? তোমরা ভাবো উপাসনা না জানি কেমন একটা ব্যাপার—এমন ভাবে বসতে হবে, অমনভাবে নিশ্বাস ফেলতে হবে, অমুক দিকে মুখ রাখতে হবে, এতগুলো মন্তর বলতে হবে, বাকি যেন এসোবে লেকিন আসলি উপাসনা হয় না। আরে ধুর্! আসলি উপাসনা হচ্ছে তাঁর সেবায়।”

তিনি বলতেন—উপাসনা করবার সময় ভাবতে হয় যেন তিনি (অর্থাৎ ইষ্ট) সামনে রয়েছেন, আর তুমি তাঁর পা ধুয়ে দিচ্ছো, তাঁকে নাওয়াচ্ছো, তাঁকে খাওয়াচ্ছো, তাঁকে হৃদয়ে বসাচ্ছো, তাঁকে সাজাচ্ছো, গোজাচ্ছো, এমনকি তাঁর পায়ে ফুল দিয়ে পুজো করছো। “হামাদের তো সেখানে তাই হোতো।”

(লাটু মহারাজের স্মৃতিকথা/ পৃ: ২৩০-২৪১)।

অপূর্ব লাটু মহারাজ, অপূর্ব তাঁর উপাসনা, উপাসনার ব্যাখ্যা। স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা, স্বামী বিবেকানন্দ ও সকল গুরুভাই কেন লাটু মহারাজকে এত স্নেহ করতেন, শ্রদ্ধা করতেন, তাঁকে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের এক অদ্ভুত সৃষ্টি বলে মনে করতেন, তা এই কাহিনি থেকেই বোঝা যায়।

শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের দিন যে সমাগত প্রায়, তা সকলেই মনে মনে বুঝতে পেরেছিলেন। বিশেষ করে শ্রীমা। কিন্তু তবুও মা নিজে বাইরে তা প্রকাশ করেননি। অন্যদের সাহস জুগিয়েছেন।

ভাবলে পরম আশ্চর্যজনক মনে হয়, চোখের সামনে দেখছেন জীবনের আরাধ্য ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছেন, তবুও তিনি নিজেকে স্থির রেখেছেন, আর সকলকে ভেঙে পড়ার থেকে আটকে রাখার জন্যে।

কিন্তু অন্তরে তিনি গভীর উৎকণ্ঠিত হয়েই তারকেশ্বরের মন্দিরে হত্যে দিয়েছিলেন। যাওয়ার সময়ে ঠাকুর স্বয়ং হাত নেড়ে মাকে দেখিয়েছেন, যে কিছুই হবে না। তবু মা গিয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ জানতেন, যে তাঁর মহাপ্রস্থানের সময় আসন্ন। আকারে-ইঙ্গিতে তিনি তা বুঝিয়েও দিয়েছিলেন।

তিনি স্বপ্ন দেখেন, ওষুধ আনতে সাদা হাতি গেল, হাতি মাটি খুঁড়ছে ওষুধের জন্য, এমন সময়ে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ গোপাল এসে ঠাকুরের স্বপ্ন ভেঙে দিলে। ঠাকুর মাকে জিজ্ঞাসা করতেন,—“কিগো!! তুমি স্বপ্নটপ্ন দ্যাখো?” শ্রীমা-ও একটি স্বপ্ন সেই সময়ে দেখেছিলেন—তবে তা দুঃখের স্বপ্ন—তিনি বলেছিলেন, মা কালী ঘাড় কাত্ করে রয়েছেন। বললুম—“মা, তুমি কেন অমন করে আছো?” মা কালী বললেন—“ওর ঐটের জন্য (ঠাকুরের গলার ঘা দেখিয়ে), আমারও তো হয়েছে।”

(সারদা দেবীঃ আত্মকথা)।

শেষের সেই দিন এসে গেল। রোগশয্যা। মহাপ্রয়াণের দিন সকাল থেকেই শ্রীমায়ের স্মৃতিচারণে—“সকাল থেকেই ওলট-পালট হতে লাগলো।” সন্তানদের জন্যে খিচুড়ি রান্না করছিলেন, সেটা ধরে গেল, মায়ের একটা লালপেড়ে দেশি শাড়ি ছিল, সেটা আর খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না, জলের কুঁজোটা তুলতে গিয়ে হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল, এইসব।

অবশেষে এলো সেই মহাকালরাত্রি। ১৮৮৬ সালের ১৬ই আগস্ট (বাংলার ৩১শে শ্রাবণ, ১২৯৩ বঙ্গাব্দ), শ্রীমা তখন সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসন্নতায় নিজের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের খবর দিলেন কালী মহারাজ (স্বামী অভেদানন্দ)। খবর শুনে মা পাগলিনীর মতো ছুটে এসে ঠাকুরকে জড়িয়ে ধরে—“মা কালী গো! তুমি আমায় ছেড়ে কোথায় গেলে..?” বলে সে কী কান্না।

গোলাপ মা, যোগীন মা, বাবুরাম মহারাজ, শরৎ মহারাজ, নরেন্দ্রনাথ, মায়ের কাছে গেলেন। গোলাপ মা, যোগীন মা মাকে ধরে মায়ের ঘরে নিয়ে গেলেন। সঙ্গে ছিলেন ঠাকুরের সব সময়ের সঙ্গী লাটু মহারাজ। তিনি স্মৃতিচারণে বলছেন—“মা একবার কান্না করেই সেই যে চুপ করলেন, আর তাঁর গলার আওয়াজ শুনা গেল না..।”

সে এক অনির্বচনীয় মুহূর্ত। শ্রীরামকৃষ্ণ মহাপ্রয়াণে চলে গেছেন। অগুনতি ভক্ত, সন্ন্যাসীদের ভিড় বাড়তে লাগলো।

পরেরদিন কাশীপুরের মহাশ্মশানে ঠাকুরের পবিত্র পার্থিব দেহ অগ্নিসংস্কারে নিয়োজিত হলো। তারপর ঠাকুরের পবিত্র ভস্মাদি একটি পাত্রে সংগ্রহ করে এনে ঠাকুরের শয্যায় স্থাপন করলেন নরেন্দ্রনাথ। আর সেই ভস্মের কিঞ্চিৎ মুখে দিয়ে গঙ্গাজল খেলেন তিনি—উচ্চারণ করলেন—“জয় শ্রীরামকৃষ্ণ”, তিন তিনবার। তাঁর সঙ্গে সঙ্গী হয়েছিলেন লাটু মহারাজ সহ ঠাকুরের সন্ন্যাসী ভক্তরা।

সন্ধ্যার সময়ে শ্রীমা তাঁর হাতের বালা খুলতে উদ্যত হলে সামনে দেখলেন সূক্ষ্ম শরীরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব দাঁড়িয়ে, তিনি বলছেন—“আমি কি কোথাও গেছি গা? এই যেমন এঘর থেকে ওঘর।” মায়ের বালা খোলা আর হয়নি তারপর।

এ এক অনন্যসাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনা এবং প্রামাণ্যতার আধ্যাত্মিক ইতিহাস। ভক্ত সন্ন্যাসীরাও একাধিকবার ঠাকুরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শরীরে উপস্থিতি অনুভব করেছেন, দর্শন করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সেই লাটু মহারাজ। তিনি স্মৃতিকথায় বলছেন,—“হামার সাথে হামার গুরুজী হর্ ওয়্খ্ত্ থাকেন, আমি দেখতে পাই, বাত্চিত্ করি। তাই আমি আমার মায়ের কাছে কাছেই থাকি।”

এই লাটু মহারাজের কথা আমরা খুবই কম জানি। এই মহারাজ ঠাকুরের ১৬ জন সাক্ষাৎ শিষ্যদের অন্যতম সন্ন্যাসী। তিনি বিহারের ছাপড়া জেলায় এক হতদরিদ্র মেষপালকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। সাল-তারিখ জানা যায় না। মহারাজের নাম ছিল—“রাখ্তুরাম”। পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবাকে হারান। এক কাকার কাছে মানুষ হন। রাখালদের সাথে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতেন। তারপর একদিন জীবিকার সন্ধানে কাকার হাত ধরে কলকাতায় চলে আসেন। অনেক ঘুরে শেষে ঠাকুরের ভক্ত শিষ্য রামচন্দ্র দত্তের (স্বামী বিবেকানন্দের আত্মীয়) বাড়িতে পরিচারকের কাজে বহাল হন। রামচন্দ্রবাবু নাম দেন লাল্টু। তারপর ১৮৭৯ সালে সেখান থেকে রামচন্দ্রের মাধ্যমে ঠাকুরের কাছে দক্ষিণেশ্বরে তিনি আসেন, আর রয়ে যান ঠাকুরের কাছে। ঠাকুর তাঁকে নাম দেন “লাটু”, তিনি লাটু মহারাজকে নিজের করে নেন।

ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের পরে লাটু মহারাজ মায়ের কাছে কাছে থাকতেন। শ্রীমা বৃন্দাবনে, বারাণসীতে তীর্থ করতে গেলে (লক্ষ্মী, গোলাপ-মা, যোগীন-মা, স্বামী সারদানন্দ, স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ সহ) লাটু মহারাজও যান মায়ের সাথে। লাটু মহারাজের সন্ন্যাস জীবনের নাম হয় “স্বামী অদ্ভুতানন্দ”, ঠাকুর আদর করে লাটু মহারাজকে “অদ্ভুত” বলে ডাকতেন, তাই। এই লাটু মহারাজ অবশেষে চলে যান বারাণসীতে।

শ্রীমা সারদা দেবীর মহাপ্রয়াণ ঘটে ১৯২০ সালের ২০শে জুলাই। আর মায়ের সন্তান এই লাটু মহারাজ (স্বামী অদ্ভুতানন্দ)-এর মহাপ্রয়াণ ঘটে তার ক’টাদিন আগে—১৯২০ সালেরই ২৪শে এপ্রিল।

আজ ১৬ই আগস্ট, আজ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের পবিত্র দিন। তাঁর স্মরণে রইল এই নিবন্ধের নিবেদন।

প্রণাম শ্রীরামকৃষ্ণ।

ট্যাগ: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, শ্রীমা সারদা দেবী, লাটু মহারাজ, স্বামী অদ্ভুতানন্দ, রামকৃষ্ণ, কাশীপুর উদ্যানবাটি, দক্ষিণেশ্বর, স্বামী বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ মঠ, রামকৃষ্ণ ভাবধারা, আধ্যাত্মিকতা, ধর্মীয় ইতিহাস, শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ

Meta Description: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাশীপুর উদ্যানবাটির শেষ দিনগুলি, শ্রীমা সারদা দেবী ও লাটু মহারাজের সেবাভাব এবং শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের স্মৃতিচারণ।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.