প্রথম পাতা প্রবন্ধ এক প্রখ্যাত সাংবাদিকের চোখে শ্রীমা সারদা

এক প্রখ্যাত সাংবাদিকের চোখে শ্রীমা সারদা

11 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

বিংশ শতাব্দীর প্রথিতযশা সাংবাদিক ও দেশপ্রেমিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৮৯১–১৯৫৪) কর্মজীবন শুরু করেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ‘নারায়ণ’ পত্রিকায়। পরে ১৯২২ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা-র জন্মলগ্ন থেকেই সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেন। ১৯২৬ থেকে ৬ জানুয়ারি ১৯৪১ পর্যন্ত তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৩৩ সালে ‘দেশ’ পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকেও তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী সারদানন্দ-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীকালে তিনি শ্রীমা সারদা দেবীর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

তাঁর স্মৃতিচারণে আমরা শ্রীমা সারদাকে এক অনন্য দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে, চিনতে ও উপলব্ধি করতে পারি।

তিনি লিখেছেন—

“কলকাতার বাগবাজার মঠে মা-কে দেখেছি নানাভাবে। কিন্তু একবার জয়রামবাটিতে গিয়ে দেখি মায়ের আর-এক রূপ। পল্লির পিতৃভবনের ওপর তাঁর অদ্ভুত আকর্ষণ। দুর্গম পথ, জিনিসপত্রের অভাব, চারদিকে দারিদ্র্য আর ম্যালেরিয়ার প্রকোপ—তবু সেখানে মায়ের যাওয়া চাই।”

বাগবাজারে তিনি ছিলেন সঙ্ঘজননী। কিন্তু জয়রামবাটিতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গ্রামের সবার আপনজন—কখনও পিসি, কখনও মাসি, কখনও দিদি, কখনও আবার স্নেহের ‘সারু’। ভাইদের সংসারের মধ্যেই তিনি যেন নিজের একটি সংসার গড়ে তুলেছিলেন।

গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে তিনি একেবারে মিশে যেতেন। তাঁদের সঙ্গে তরকারি কাটা, ঘরদোর গোবর-গঙ্গাজল দিয়ে নিকোনো, রান্না করা, পুকুর থেকে কলসি ভরে জল আনা—সব কাজই করতেন। পায়ে বাতের ব্যথা থাকা সত্ত্বেও তিনি এসব কাজে পিছপা হতেন না।

তিনি গ্রামের সমস্ত সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন, কিন্তু মানতেন না জাতিভেদ। নিজের হাতে ভক্তদের খাইয়ে তাঁদের উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করতেও দ্বিধা করতেন না। কেউ আপত্তি করলে তিনি তা গ্রহণ করতেন না।

গ্রামের কারও বিপদ-আপদে তিনিই ছিলেন প্রথম আশ্রয়। সকলেই তাঁকে নিজেদের পরিবারের সদস্য বলে মনে করত।

উচ্চশিক্ষিত, যুক্তিবাদী ও আধুনিক মননের মানুষ সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বিস্ময়ের সঙ্গে লিখেছেন—

“কলহপরায়ণ, সংকীর্ণস্বভাব, অমার্জিত রুচির আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের অন্যায় ও রূঢ় ব্যবহার মা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অম্লানবদনে সহ্য করেছেন।”

এই অভিজ্ঞতার পর তিনি লিখেছেন—

“কী অসাধারণ ছিল মায়ের ধৈর্য, সহনশীলতা, সহিষ্ণুতা, ক্ষমাশীলতা এবং আত্মপরিচয় গোপন রাখার আশ্চর্য সংযম।”

অথচ তখনই তিনি অসংখ্য ভক্তের কাছে জগজ্জননী, সঙ্ঘজননী এবং শ্রীশ্রীমা। স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যবৃন্দ, ভগিনী নিবেদিতা, জোসেফিন ম্যাকলাউড, সারা ওলি বুল, মিসেস সেভিয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীঅরবিন্দ, জগদীশচন্দ্র বসু-সহ অগণিত মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধার পাত্র।

কিন্তু জয়রামবাটিতে তিনি নিজেকে কখনও সেই রূপে প্রকাশ করেননি। সেখানে তিনি ছিলেন একেবারে সাধারণ গ্রামের মা, সকলের আপনজন।

সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার নিজেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—মা জয়রামবাটিতে থাকতে এত ভালোবাসতেন কেন?

তাঁর উপলব্ধি ছিল, মা সেখানে থাকলে গ্রামের দরিদ্র মানুষ উপকৃত হতেন। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসতেন। গ্রামের মানুষ তাঁদের দুধ, শাকসবজি, আনাজ, ফলমূল বিক্রি করতে পারতেন। এতে তাঁদের সংসারে কিছু অর্থ আসত। একই সঙ্গে তাঁরা মায়ের সান্নিধ্যও লাভ করতেন।

মায়ের আগমনের খবর পেলেই তাই গোটা গ্রাম আনন্দে ভরে উঠত।

তিনি গ্রামের সকল মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসতেন। দারিদ্র্য, কষ্ট, অভাব—সবকিছুর মধ্যেও গ্রামের জীবনযাত্রা ও লোকাচারকে তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কখনও লোকবিশ্বাস বা গ্রামীণ সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করেননি।

সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার লিখেছেন—

“মা-কে দেখে আমার পরমাত্মীয় বিশ্বাস হয়েছে। মা সাজানো নন, তিনি সত্যিকারেরই আমাদের মা। ইংরেজি প্রবাদ—’Example is better than advice’—মায়ের জীবনেই যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে উঠেছিল।”

তাঁর ‘যুগ জননী’ গ্রন্থে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার আরও লিখেছেন—

“সুখে-দুঃখে, সাংসারিক বিরোধ ও তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি নিজের জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই শান্তির পথ দেখিয়ে গেছেন। সংসারের সব কোলাহলের মধ্যেও তাঁর মন ছিল সর্বদা প্রশান্ত ও ঊর্ধ্বমুখী। সব কিছুর মধ্যে থেকেও যেন তিনি কোনও কিছুতেই নেই—এটাই মায়ের সত্যিকারের রূপ।”

শ্রীমা সারদার জীবন তাই শুধু আধ্যাত্মিকতার নয়, মানবিকতা, সহিষ্ণুতা, আত্মত্যাগ ও কর্মযোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনদর্শন আজও সমাজকে পথ দেখায়।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.